আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আইনি ও প্রশাসনিক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আটক করার দাবি তুলেছে ইরান। ইরানের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হাসান রহিমপুর আজঘাদি আজ এক বিস্ফোরক বিবৃতিতে এই দাবি জানান।
ইরানি সংবাদমাধ্যম 'ইরান ইন্টারন্যাশনাল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজঘাদি মনে করেন ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও স্বৈরাচারী আচরণ বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন হোক বা শাসনকাল শেষ হওয়ার পর, ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সময়ের দাবি।
হাসান রহিমপুর আজঘাদি তার বক্তব্যে বিশ্বনেতাদের নীরবতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো দেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করার চেষ্টা করে, তখন বিশ্ববিবেক চুপ থাকে। অথচ ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে প্রকাশ্যে উসকানি দিচ্ছেন।
আজঘাদির মতে, ট্রাম্পের নীতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বিশেষ করে ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার চেষ্টার জন্য তাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পকে আটক করার দাবি তোলা ইরানের পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পাল্টা আঘাত।
আজঘাদির এই মন্তব্যের ঠিক একদিন আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্পকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের উদাহরণ টেনে বলেন, যেভাবে পরাক্রমশালী রাজতন্ত্রের পতন ঘটেছিল, ঠিক একইভাবে অহংকারী ট্রাম্পের পতনও অনিবার্য। খামেনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প নিজের দেশের হাজারো সমস্যা আড়াল করতে ইরানের দিকে আঙুল তুলছেন।
তিনি বলেন, ট্রাম্পের উচিত নিজের দেশের সংকটের দিকে নজর দেওয়া। ইরানি জাতি শত শত প্রাণের বিনিময়ে এই প্রজাতন্ত্র গড়েছে, কোনো উসকানিদাতার কাছে আমরা নতি স্বীকার করব না।
বর্তমানে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। তেহরান মনে করে, এই বিক্ষোভের পেছনে ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে। খামেনি তার ভাষণে বলেন, কিছু বিদেশি চর এবং উসকানিদাতা দেশের সম্পদ ধ্বংস করে হোয়াইট হাউসকে খুশি করার চেষ্টা করছে। তবে ইরান তাদের এই নীল নকশা সফল হতে দেবে না।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, যদি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় বা হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। এই সামরিক হুমকির পরই তেহরান থেকে ট্রাম্পকে গ্রেফতারের পাল্টা দাবি সামনে এলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই শুরুটা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উত্তপ্ত। একদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অন্যদিকে ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। উত্তেজনার মূল কারণ হিসেবে ইরান দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘরোয়া রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান নিজ দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে এবং ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে।
ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পর এখনও পর্যন্ত হোয়াইট হাউস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কড়া প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে মার্কিন মিত্ররা ইরানের এই বক্তব্যকে হাস্যকর ও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানালেও মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছে। হাসান রহিমপুর আজঘাদির এই মন্তব্য কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মত নয়, বরং এটি ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ট্রাম্পকে গ্রেফতারের দাবি তুলে ইরান আসলে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়। আগামী কয়েক দিন এই দুই শক্তির বাগযুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক তেলের বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।