বেনাপোল প্রতিনিধি:: বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষে কর্মরত কর্মচারীদের প্রায় ২১ বছর ধরে চালু থাকা অতিরিক্ত সময়(ওভার টাইম) কাজের জন্য প্রদত্ত ‘অধিকাল ভাতা’ বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাতা পূনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্থলবন্দরে কর্মরত সর্বস্তরের কর্মচারীরা।
এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরে কর্মরত কর্মচারিরা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বেনাপোল স্থলবন্দরের রাজস্ব অফিসের নীচে অবস্থান নেন। তারা অবিলম্বে অধিকাল ভাতা’ চালুর জোর দাবি জানান।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা প্রবিধানমালা-২০২৫ এর ধারা ৩ (ক) এবং বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা প্রবিধানমালা-২০০৭ এর ধারা ৩ (ক, খ, গ, ঘ) অনুযায়ী প্রশাসনিক ও রাজস্ব দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত। তবে বাস্তবতায় বেনাপোল-পেট্রাপোল আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত। পাশাপাশি প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ৬টা থেকেই।
এছাড়া প্রধান দপ্তরের ২৬ জুলাই ২০১৭ তারিখের স্মারক অনুযায়ী ১ আগস্ট ২০১৭ থেকে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা চালুর নির্দেশনা রয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দর কার্যক্রম পরিচালনা বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি কর্মচারীদের।
কর্মচারীরা জানান, আমদানি-রপ্তানি সচল রাখা ও জাতীয় রাজস্ব আদায়ে সহোযোগিতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির স্বার্থে তাদের অনেক সময় সকাল ৬টা থেকে শুরু করে মধ্যরাত কিংবা ভোর ২-৩টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এ অতিরিক্ত কাজ কোনোভাবেই স্বেচ্ছামূলক নয়।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ১৮তম বোর্ড সভায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ‘অধিকাল ভাতা’ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে ভাতা প্রদান করা হলেও গত নভেম্বর-২০২৫ থেকে অদ্যবধি ‘অধিকাল ভাতা’ পরিশোধ করা হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কোনো আশানুরুপ সাড়া পাওয়া যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রবিধি-৩ শাখার ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের একটি স্মারকের কথা উল্লেখ করে সকল স্থলবন্দরের অভিন্ন ‘অধিকাল ভাতা’ প্রদানে অসম্মতির বিষয়টি জানানো হয়।
কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনেও তাদের কাজ করতে হয়। এমনকি করোনাকালীন লকডাউনের সময় জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ এখন ‘অধিকাল ভাতা’ বন্ধ থাকায় শ্রমের শোষণ হচ্ছে এবং মানবাধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে।
তারা আরও জানান, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর ৯৯ (১) ও ১০৮ ধারায় নির্ধারিত কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত কাজের জন্য ‘অধিকাল ভাতা’ প্রদানের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক মৌলিক অধিকার।
অবিলম্বে ‘অধিকাল ভাতা’ পুনরায় চালু না হলে কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় বিষয়টি মানবিক ও যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন বন্দর কর্মচারীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ স্থলবন্দর এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের এক নেতা জানান, কয়েক মাস আগে থেকে সারা দেশের স্থলবন্দরে কর্মরত কর্মচারিদের ’অধিকাল ভাতা’ বন্ধ রাখা হয়। গত মাস থেকে বেনাপোল স্থলবন্দরে কর্মরত কর্মচারীদের ’অধিকাল ভাতা’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যা নিয়ে কর্মচারীদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বন্দরের রাজস্ব অফিসের নীচে ব্যানার নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
এ ব্যাপারে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ ব্যাপারে গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মহোদয়ের নিকট পত্র দিয়ে জানানো হয়েছে। পত্রে বেনাপোল স্থলবন্দরের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মচারিগন কর্তৃক সরকার নির্ধারিত অফিস সময়ের পর অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য ‘অধিকাল ভাতা’ পাওয়ার জন্য তাদের আবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়েছে। বিষয়টি এখন প্রধান দপ্তরের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে তিনি জানান।