ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বাংলাদেশ সীমান্ত ঘিরে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা উদ্বেগ ও কৌশলগত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত একাধিক বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লি। মূলত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় অবস্থিত এসব পুরোনো বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করাই এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।
মঙ্গলবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে এ তথ্য। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে থাকার সময়েই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তকারী সংকীর্ণ ভূখণ্ড শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকিই এই পদক্ষেপের অন্যতম কারণ বলে তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণ উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত এই বিমানঘাঁটি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা মহলে বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে এই করিডোর বিচ্ছিন্ন করার হুমকির কথাও একাধিকবার উঠে এসেছে বলে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন।
এরই মধ্যে ভারত ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া, বিহারের কিশানগঞ্জ এবং আসামের ধুবরি জেলায় নতুন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব এয়ারস্ট্রিপ বা বিমানঘাঁটি সংস্কারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জলপাইগুড়ির আমবাড়ি ও পাঙ্গা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, মালদহের ঝালঝালিয়া এবং আসামের ধুবরি। এর বাইরে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও আসামের কোকরাঝাড় জেলার রূপসি বিমানঘাঁটি ইতোমধ্যেই চালু রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলগুলোর বিমানঘাঁটির গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল মিত্রবাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এগুলো। বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিমুখে জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে অসংখ্য এয়ারস্ট্রিপ। এগুলো চীন–বার্মা–ভারত থিয়েটার, বার্মা ক্যাম্পেইন এবং লেডো (স্টিলওয়েল) রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথকে সমর্থন দিয়েছিল।
সেই সময় একাধিক বিমানঘাঁটি ব্যবহার করেছিল মার্কিন বাহিনীও। বি-২৪ লিবারেটর ও বি-২৯ সুপারফোর্ট্রেস বোমারু বিমান এসব ঘাঁটি থেকে অভিযান চালাত। হাইলাকান্দি ও দুধকুণ্ডির মতো এয়ারফিল্ডগুলো বোমা হামলা, পরিবহন ও বিশেষ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। রূপসি বিমানঘাঁটি ব্রিটিশদের হাতে তৈরি হয়েছিল মিত্রবাহিনীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে, যা পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান চলাচলেও ব্যবহৃত হয়। তবে, ২০২১ সালে বাণিজ্যিক এবং সামরিক উভয় ব্যবহারের জন্য উডান প্রকল্পের অধীনে পুনরায় সচল করা হয় একে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, ভারতের দৃষ্টিতে এসব ঐতিহাসিক বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবন কেবল যোগাযোগ উন্নয়ন নয়, বরং কৌশলগত গভীরতা বাড়ানোরও একটি বড় পদক্ষেপ। একসময় যে অঞ্চল বিশ্বযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল, সেই অঞ্চলই আবারও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।