ডেস্ক:: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের আলোচিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) দেওয়া অভিযোগপত্রের ওপর বাদীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি এখন অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মামলার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে সিআইডিকে তাদের অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
ডিবির অভিযোগপত্র ও বাদীর অনাস্থা গত ১২ ডিসেম্বর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় দিনের আলোতে গুলি করা হয়েছিল তরুণ নেতা ওসমান হাদিকে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ গত ৬ জানুয়ারি ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে মামলার শুরু থেকেই বাদীর পক্ষ থেকে অভিযোগপত্রের বিষয়বস্তু এবং আসামিদের ভূমিকার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল।
গত ১২ জানুয়ারি বাদী পক্ষ অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য সময় চাইলে আদালত আজকের দিনটি ধার্য করেন। আজ শুনানির শুরুতে বাদীপক্ষ ডিবির দেওয়া তথ্যের ওপর ‘নারাজি’ বা অনাস্থা প্রকাশ করে আবেদন জানান। তাঁদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের গভীর নেপথ্য কারিগর ও সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য ডিবির তদন্তে উঠে আসেনি।
কারা পলাতক ও কারা কারাগারে ডিবির দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী ১৭ জনের নাম উঠে এলেও এর মধ্যে মূল হোতা ও নেপথ্য শক্তি হিসেবে পরিচিত প্রধান আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ বর্তমানে পলাতক। তার সাথে পলাতক রয়েছেন তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। এছাড়া ফিলিপ স্নাল ফিলিপস, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তারও পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে মূল তিন আসামি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে ১১ জন আসামি কারাগারে রয়েছেন। এদের মধ্যে ফয়সালের নিকটাত্মীয় হিসেবে তাঁর বাবা হুমায়ুন কবির, মা হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন এবং বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা রয়েছেন।
এছাড়া শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট এ কার ব্যবসায়ী মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী, ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির, সিবিয়ন দিউ, সঞ্জয় চিসিম, আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু এবং অস্ত্রসহ আটক ফয়সাল আটক রয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও ভয়াবহতা মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওসমান হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ার লক্ষে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন। তাঁর বলিষ্ঠ বক্তব্য ও আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান অনেক মহলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
১২ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি যখন মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন, তখন পল্টন বক্স কালভার্ট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁর মাথা ও ডান কানের নিচে গুলি করে। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
আদালতের নির্দেশনা ও সিআইডির চ্যালেঞ্জ আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান সিআইডি তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
আধিপত্যবাদী শক্তির ইশারায় এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি। সিআইডির ওপর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা। সেই সাথে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করা, বিশেষ করে এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক বা দেশীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সরাসরি সংশ্রব ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা। এছাড়া বাদীর নারাজি আবেদনে যেসব অসংগতির কথা বলা হয়েছে, তা যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন ২০ জানুয়ারির মধ্যে পেশ করা।
ইনকিলাব মঞ্চ ও রাজপথের উত্তাপ আদালতের এই আদেশের পর ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হলেও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বহাল রাখা হয়েছে। আগামীকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনের নেতাদের দাবি, হাদির খুনিদের শুধু শনাক্ত নয়, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও ইতোপূর্বে হাদির খুনিদের দ্রুত বিচার ও বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছিলেন। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও এই বিচার প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড কেবল একটি খুনের মামলা নয়, এটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি বড় পরীক্ষা। সিআইডির অধিকতর তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে কি না, তা দেখার জন্য পুরো দেশ এখন ২০ জানুয়ারির দিকে তাকিয়ে আছে।