ডেস্ক:: আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ওইদিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক গণভোট ২০২৬। রাষ্ট্র সংস্কারের চার দফা রূপরেখা বাস্তবায়নের এই যুদ্ধে এবার সরাসরি শামিল হলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস।
শনিবার সকালে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক ও এক্স হ্যান্ডল থেকে বিশেষ ফটোকার্ড শেয়ার করে দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার এই প্রচারণা মূলত জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তার প্রতি জনসমর্থন আদায়ের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পথ’ শনিবার বেলা ১১টার দিকে প্রধান উপদেষ্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজগুলো থেকে শেয়ার করা ফটোকার্ডটিতে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা ফুটে উঠেছে। সেখানে লেখা হয়েছে, গণভোট ২০২৬: দেশকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিন, ‘হ্যাঁ’তে সিল দিন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, এই প্রচারণা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত ১১ জানুয়ারি থেকে গণভোটের সপক্ষে জনসচেতনতা বাড়াতে ফটোকার্ড শেয়ারের এই ধারাবাহিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা আগামীকাল ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এর লক্ষ্য হলো নাগরিকদের জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও সংস্কার প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করা এবং ভোটকেন্দ্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রজুড়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের হাওয়া কেবল প্রধান উপদেষ্টাই নন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় সব উপদেষ্টাই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সভা সেমিনারে অংশ নিয়ে গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সরকারিভাবে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিটিভি সহ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরাও তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় গণভোটের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রধান ডক্টর আলী রীয়াজ সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, মার্কার ব্যালটে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার পাশাপাশি গণভোটে 'হ্যাঁ' দিন, যাতে আগামীর বাংলাদেশ একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
কেন এই গণভোট? চার দফা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা ভোটাররা ব্যালট পেপারে একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। তবে এই একটি ভোটই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনতন্ত্র। গণভোটের জন্য নির্ধারিত চারটি মূল বিষয়ের প্রথমটি হলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন। ভবিষ্যতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগ হবে জুলাই সনদে বর্ণিত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের আইনসভা হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষ নির্বাচিত হবে সরাসরি ভোটে এবং দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে একটি উচ্চকক্ষ। যেকোনো সংবিধান সংশোধনীতে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হবে।
তৃতীয়ত ক্ষমতার ভারসাম্য ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতায়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখা, এই ৩০টি প্রস্তাবে যে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
চতুর্থত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এই গণভোটের মাধ্যমে সেই সংস্কারগুলোকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হবে।
ব্যালটেই চূড়ান্ত ফয়সালা রাষ্ট্র সংস্কারের এই বিশাল কর্মকাণ্ডকে জনমতের ভিত্তিতে আইনি রূপ দিতেই গণভোটের আয়োজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি জনগণের রায় নিয়ে সংবিধান বা রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন করলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল চাইলেও সহজে এই সংস্কারগুলো বাতিল করতে পারবে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের দিন নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন পরিচয় নির্ধারণের দিন। প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান এবং সরকারের প্রচারণার ঢেউ এখন তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছেছে। চারটি বড় বিষয়ের ওপর যে একটি প্রশ্ন ভোটারদের সামনে থাকবে, তার ‘হ্যাঁ’ উত্তরই হতে পারে আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সোপান। এখন দেখার বিষয়, সাধারণ ভোটাররা ব্যালট বক্সের মাধ্যমে ডক্টর ইউনূসের এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেন।