ক্রীড়া প্রতিবেদক:: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র ১৮ দিন বাকি। কিন্তু বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটার বদলে আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতেই ম্যাচ খেলতে হবে। অন্যথায় টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার চরম ঝুঁকি নিতে হবে টাইগারদের।
সোমবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
আইসিসি এবং বিসিবির মধ্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। ক্রিকইনফো ও এএফপি’র সূত্রমতে, আইসিসি বিসিবিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আগামী বুধবার (২১ জানুয়ারি) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
যদি বুধবারের মধ্যে বাংলাদেশ ভারতে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি না জানায়, তবে আইসিসি বিকল্প পরিকল্পনা কার্যকর করবে। আইসিসি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরে দাঁড়ালে তাদের পরিবর্তে টুর্নামেন্টে সুযোগ না পাওয়া দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংধারী দল স্কটল্যান্ডকে মূল পর্বে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক বিশাল বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিসিবি শুরু থেকেই নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতে খেলতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। বিসিবির দাবি ছিল, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হোক। বিসিবির এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আলোচনার সময় বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির কাছে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে। খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার।"
এমনকি বিসিবি আয়ারল্যান্ডের সাথে গ্রুপ অদলবদলের একটি ‘হাইব্রিড’ প্রস্তাবও দিয়েছিল, যাতে বাংলাদেশের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় পড়ে। কিন্তু আইসিসি এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
ক্রিকেটীয় এই দ্বৈরথের মূলে রয়েছে দুই দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে শৈত্যপ্রবাহ চলছে।
মোস্তাফিজ ইস্যু: গত ৩ জানুয়ারি আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) ভারতীয় বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দিলে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সংখ্যালঘু ইস্যু: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে পাল্টা জবাবে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অভিযোগ করেন যে, ভারত সহিংসতার চিত্র বাড়িয়ে বলছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ছায়া এখন খেলার মাঠে দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের দশম আসরে বাংলাদেশ রয়েছে ‘সি’ গ্রুপে। এই গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল ও ইতালি। আইসিসির সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আইসিসি বারবার কলকাতা ও মুম্বাইয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও বিসিবি কোনোভাবেই ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছে না।
ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বাংলাদেশের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাকিস্তান ইঙ্গিত দিয়েছে, বাংলাদেশের সাথে অবিচার করা হলে তারা তাদের অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাববে। আইসিসি এখন এক কঠিন সংকটে—যদি বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান উভয় দল সরে যায়, তবে বিশ্বকাপের প্রচারসত্ত্ব এবং দর্শকপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। অন্যদিকে, বিসিসিআই-এর প্রভাবের কারণে আইসিসিও ভারতকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি সম্ভবত প্রথমবার, যেখানে একটি পূর্ণ সদস্য দেশকে নিরাপত্তা ইস্যুতে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বুধবারের মধ্যে বিসিবি কি নমনীয় হবে, নাকি বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে এক বিশাল আর্থিক ও পেশাদার ক্ষতির ঝুঁকি নেবে? ক্রিকেট বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ২১ জানুয়ারির সেই অন্তিম ক্ষণের দিকে।