আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের শান্ত শহর লরেন্সভিল। গত শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় বারুদ আর রক্তের গন্ধে। পারিবারিক বিবাদের চরম পর্যায়ে পৌঁছে ৫১ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক বিজয় কুমার নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছেন নিজের সাজানো সংসার।
তাঁর বন্দুকের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন স্ত্রী মিনু ডোগরাসহ পরিবারের চার সদস্য। হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়িতে থাকা তিনটি শিশু মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে যেভাবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে, তা এখন লরেন্সভিল পুলিশের মুখে মুখে ফিরছে।
সেই কালরাত, ব্রুক আইভি কোর্টের রক্তাক্ত অধ্যায় পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে লরেন্সভিলের ব্রুক আইভি কোর্ট এলাকার একটি বাড়ি থেকে জরুরি সেবা ৯১১ নম্বরে একটি কল আসে। ওপাশ থেকে একটি শিশুর আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর সাহায্য চাচ্ছিল। দ্রুত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের মেঝেতে চারজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সবার শরীরেই বুলেটের অসংখ্য ক্ষত ছিল।
নিহতরা হলেন বিজয় কুমারের স্ত্রী মিনু ডোগরা (৪৩), গৌরব কুমার (৩৩), নিধি চন্দর (৩৭) এবং হরিশ চন্দর (৩৮)। এঁদের মধ্যে হরিশ চন্দর সরাসরি ভারতীয় নাগরিক ছিলেন এবং ভিজিটর বা পর্যটক অথবা কাজের সূত্রে সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিশুদের অলৌকিক রক্ষা, আলমারিতে লুকানো সেই মুহূর্ত হত্যার তাণ্ডব যখন শুরু হয়, তখন ঘরে ছিল তিনটি শিশু। বিজয় কুমার যখন একে একে স্বজনদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিলেন, তখন শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে ঘরের একটি আলমারির ভেতরে লুকিয়ে পড়ে। অন্ধকারের মধ্যে আলমারির ভেতরে জবুথবু হয়ে বসে তারা এই বীভৎসতা প্রত্যক্ষ করে।
এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজের কাছে থাকা ফোন থেকে ৯১১ নম্বরে কল দেয়। পুলিশ পৌঁছানো পর্যন্ত তারা আলমারি থেকে বের হয়নি। পুলিশ আসার পর অক্ষত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে শিশুরা অন্য এক নিকটাত্মীয়ের হেফাজতে থাকলেও তারা চরম মানসিক ট্রমার বা আঘাতের মধ্যে রয়েছে।
অভিযুক্ত বিজয় কুমার ও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘটনাস্থল থেকেই অভিযুক্ত বিজয় কুমারকে গ্রেপ্তার করেছে লরেন্সভিল পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পারিবারিক কলহের কথা উঠে এলেও ঠিক কী কারণে তিনি এত বড় নৃশংসতা চালালেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালত ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিজয় কুমারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে চারটি সুপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ বা ফোর কাউন্টস অব মার্ডার, শিশুদের সামনে এমন নৃশংসতা চালানো এবং তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার কারণে শিশু নির্যাতনের প্রথম ও তৃতীয় মাত্রার একাধিক অভিযোগ বা চাইল্ড ক্রুয়েলটি এবং মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগ বা অ্যাগ্রাভেটেড অ্যাসাল্ট আনা হয়েছে।
ভারতীয় কনস্যুলেটের প্রতিক্রিয়া আটলান্টায় অবস্থিত ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল এই ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক। শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে আইনি সহায়তা এবং মৃতদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। কনস্যুলেট কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
স্তব্ধ প্রবাসী সমাজ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় এবং দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঘটনা গভীর ক্ষোভ ও শোকের জন্ম দিয়েছে। মিনু ডোগরা ও বিজয় কুমারের পরিচিতরা জানান, বাইরে থেকে তাঁদের জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে যে এমন আগ্নেয়গিরি জমে ছিল, তা কেউ আঁচ করতে পারেনি।
বিজয় কুমারের এমন হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা এবং শিশুদের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন সমাজবিজ্ঞানীরা। লরেন্সভিল পুলিশের প্রধান জানিয়েছেন, এটি আমাদের শহরের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা। আমরা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি এবং অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে কাজ করছি।