ডেস্ক:: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক ও অংশগ্রহণকারীদের সব ধরণের আইনি হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার।
রোববার রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশটি জারি করেন, যার মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে করা আগের সব মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।
অধ্যাদেশের মূল বৈশিষ্ট্য ও মামলার অব্যাহতি আইন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই অধ্যাদেশের ফলে জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কারণে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি অভিযোগ বা মামলা থেকে থাকে, তবে তা বিশেষ বিধানে প্রত্যাহার করা হবে। কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটর বা পিপি অথবা সরকার নিযুক্ত আইনজীবী আদালতে এই মর্মে আবেদন করবেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অংশ ছিলেন। এমন আবেদন জমা পড়ার সাথে সাথে আদালত ওই মামলার সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেবেন।
অভিযুক্ত ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ মামলা থেকে অব্যাহতি বা খালাস পাবেন। এটি একটি আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে, যাতে রাজনৈতিক বা প্রতিহিংসামূলক কোনো মামলা গণ-অভ্যুত্থানকারীদের জীবন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।
হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত বিশেষ বিধান ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে দায়মুক্তি দেওয়া হলেও ন্যায়বিচারের স্বার্থে একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। যদি কোনো গণ-অভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে ওই সময়ে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা সরাসরি আদালতে না গিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করতে হবে। কমিশন এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যদি নিহত ব্যক্তি কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন, তবে সেই বাহিনীর কোনো বর্তমান বা প্রাক্তন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া তদন্ত চলাকালে যদি কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হয়, তবে মানবাধিকার কমিশনের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিরোধ বনাম অপরাধমূলক অপব্যবহার মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে যদি দেখা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা কেবল রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, তবে কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।
এই ধরণের ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো সাধারণ আদালতে মামলা করার আর সুযোগ থাকবে না। তবে যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কেউ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক অপব্যবহার করেছে, তবে কমিশন ওই প্রতিবেদন আদালতে জমা দেবে। আদালত সেই প্রতিবেদনকে নিয়মিত পুলিশ প্রতিবেদনের সমতুল্য গণ্য করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করবেন।
প্রেক্ষাপট ও অনুমোদন এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক জায়গায় অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধেই স্বার্থান্বেষী মহলের মামলা করার চেষ্টার প্রেক্ষাপটে সরকার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জনমনে প্রতিক্রিয়া এই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল যাতে আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের পরবর্তী সময়ে কোনো রাষ্ট্রশক্তির রোষানলে পড়তে না হয়। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুরক্ষা অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে গণ-অভ্যুত্থান ও নাগরিক প্রতিরোধের অধিকারকে একটি শক্ত আইনি ভিত্তি প্রদান করল।