ক্রীড়া প্রতিবেদক:: ফুটবল বিশ্বের চিরন্তন প্রশ্ন লিওনেল মেসি নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো? এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি আনহেল ডি মারিয়া। ডি মারিয়া এমন এক বিরল খেলোয়াড় যিনি রিয়াল মাদ্রিদে দীর্ঘ চার বছর রোনালদোর সতীর্থ ছিলেন এবং প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পাশে খেলেছেন।
ডি মারিয়া অকপটে স্বীকার করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রম এবং পেশাদারিত্বের বিচারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অদ্বিতীয়। তিনি বলেন, পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে ক্রিস (রোনালদো) নিশ্চিতভাবেই এক নম্বর। সে যেভাবে নিজেকে তৈরি করে, নিজের শরীরের যত্ন নেয় এবং মেসির সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
তবে যখন ফুটবলের নিরেট প্রতিভার কথা আসে, তখন ডি মারিয়ার পাল্লা মেসির দিকেই ঝুঁকে থাকে। তিনি একটি চমৎকার তুলনা দিয়ে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। ডি মারিয়ার মতে, রোনালদোর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তার অদম্য পরিশ্রম, কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।
তিনি বলেন, রোনালদোকে সেরা হওয়ার জন্য দিনরাত খাটতে হয়েছে। অন্যদিকে মেসি ড্রেসিংরুমে বসে ‘মাতে’ (আর্জেন্টাইন পানীয়) পান করে মাঠে নেমে যায় এবং বুঝিয়ে দেয় যে সেরা হওয়ার জন্য ঈশ্বর তাকে বিশেষ উপহার দিয়ে পাঠিয়েছেন।
ডি মারিয়া মনে করেন, রোনালদো সর্বকালের অন্যতম সেরা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কিছুটা ‘দুর্ভাগা’। কেন? কারণ তাকে একই সময়ে আরেকজন ‘নির্বাচিত’ ফুটবলারের (মেসি) সাথে লড়াই করতে হয়েছে। ডি মারিয়ার মতে, পরিসংখ্যানই সব কথা বলে দেয়—মেসির ৮টি ব্যালন ডি’অর এবং রোনালদোর ৫টি। এছাড়া ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় মেসিকে এই বিতর্কে অনেক এগিয়ে দিয়েছে।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে এখন সবার নজর ম্যানচেস্টারের ইতিহাদ স্টেডিয়ামে। তুরস্কের জায়ান্ট ক্লাব গালাতাসারের হয়ে ভিক্টর ওসিমহেন আজ রাতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির। নাইজেরিয়ান এই স্ট্রাইকার এখন বিধ্বংসী ফর্মে রয়েছেন।
চলতি মরসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের মাত্র ৫টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ওসিমহেন ইতোমধ্যে ৬টি গোল করেছেন। আয়াক্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক থেকে শুরু করে লিভারপুল ও বোডো/গ্লিম্টের বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলগুলো গালাতাসারেকে নকআউট পর্বের দৌড়ে টিকিয়ে রেখেছে। সমর্থকদের বিশ্বাস, ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ওসিমহেন আজ গোলের বন্যা বইয়ে দেবেন।
কেবল গালাতাসারে সমর্থকরাই নয়, পুরো নাইজেরিয়া আজ ওসিমহেনের অপেক্ষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাইজেরিয়ান ভক্তরা তাদের ‘ভাই’-এর সমর্থনে বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটি লিগ পর্বে ১১তম এবং গালাতাসারে ১৭তম স্থানে রয়েছে। সিটির রক্ষণভাগের দুই স্তম্ভ রুবেন ডিয়াস এবং জোসকো গভর্ডিওলের অনুপস্থিতি ওসিমহেনের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। যদি গালাতাসারে আজ জয় পায়, তবে তারা সরাসরি শেষ ১৬-তে ওঠার পথে অনেকখানি এগিয়ে যাবে।
নাইজেরিয়ার জাতীয় দল ‘সুপার ইগলস’ নিয়ে বর্তমানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে ফুটবল বিশ্বে। ডাচ কোচ সাইমন কালিকা থেকে শুরু করে সাবেক খেলোয়াড় এনডুকা উগবাডেসবাই নাইজেরিয়ান ফুটবলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন।
ডাচ কোচ সাইমন কালিকা এক সাক্ষাৎকারে ফিফাকে সতর্ক করে বলেছেন যে, নাইজেরিয়া ছাড়া বিশ্বকাপ হবে প্রাণহীন ও একঘেয়ে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে নাইজেরিয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কালিকা বলেন, নাইজেরিয়া হলো ব্রাজিল বা স্পেনের মতো। তাদের বিশ্বকাপে না থাকা মানে ফুটবলের গ্ল্যামার কমে যাওয়া। সুপার ইগলসের তরুণ প্রতিভাগুলো বিশ্বের কাছে প্রদর্শিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে নাইজেরিয়ার সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার এনডুকা উগবাডে বর্তমান কোচ এরিক চেলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২৫ আফ্রিকান কাপ অফ নেশনস (AFCON)-এ নাইজেরিয়া ব্রোঞ্জ জিতলেও তারা ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দল। উগবাডে বলেন, টমেটো রোপণ করেই পরের দিন ফল আশা করা বোকামি। চেল দলকে তিল তিল করে গড়ে তুলছেন। শেষ তিনটি ম্যাচে আমরা একটি গোছানো ফুটবল দেখেছি। রক্ষণভাগে কিছু দুর্বলতা থাকলেও সময়ের সাথে তা ঠিক হয়ে যাবে।
নাইজেরিয়া ফুটবল ফেডারেশন (NFF) বর্তমানে এরিক চেলের চুক্তি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যদিও তিউনিসিয়া এবং গ্যাবনের মতো দেশগুলো তাকে পাওয়ার জন্য ওত পেতে আছে।
ডি মারিয়ার বিশ্লেষণ: রোনালদো কঠোর পরিশ্রমের উদাহরণ আর মেসি বিধাতার সৃষ্টি। পরিসংখ্যান ও বিশ্বকাপ জয়ই মেসিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে।
ওসিমহেন ফ্যাক্টর: ৬ ম্যাচে ৬ গোল নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে সিটির মুখোমুখি ওসিমহেন। সিটি রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিতে প্রস্তুত গালাতাসারে।
নাইজেরিয়ার আর্তনাদ: সুপার ইগলস ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপ ফিফার জন্য বাণিজ্যিক ও বিনোদনমূলক ক্ষতি। কোচ চেলের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর ভরসা রাখার আহ্বান।
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্ব এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে পুরনো গ্রেটদের বিদায়বেলা চলছে আর ওসিমহেনের মতো নতুন রাজারা সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে মত্ত।