আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত বৃহস্পতিবার এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশন (পিসবিল্ডিং কমিশন, পিবিসি) এর ব্যুরো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ আগামী এক বছরের জন্য সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি স্থাপন ও সংঘাত পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রভাব ও সক্ষমতা আরও একবার প্রমাণিত হলো।
শুক্রবার সকালে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অর্জনের কথা জানানো হয়েছে। ব্যুরো নির্বাচনের পর কমিশনের ২০তম অধিবেশনের প্রথম সভায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। নির্বাচনে বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখায় কমিশনের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।
বিবৃতিতে বাংলাদেশ জানিয়েছে, এ দায়িত্ব প্রাপ্তি কেবল সম্মানের নয়, বরং জাতিসংঘের শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের এ ২০তম অধিবেশনে মরক্কোকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি সহসভাপতি হিসেবে আরও তিনটি প্রভাবশালী দেশ জার্মানি, ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়া নির্বাচিত হয়েছে। অধিবেশনটিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং মহাসচিবের শেফ ডি ক্যাবিনেট উপস্থিত ছিলেন। তারা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য প্রদান করেন এবং নবনির্বাচিত সদস্যদের অভিনন্দন জানান।
শান্তি বিনির্মাণ কমিশন বা পিবিসি হলো জাতিসংঘের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সংস্থা। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কমিশনের মূল কাজ হলো সংঘাতকবলিত দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করা এবং সংঘাত পরবর্তী পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কৌশলগত পরামর্শ প্রদান করা। কমিশনটি মোট ৩১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত।
এর সদস্যরা মূলত চারটি ক্ষেত্র থেকে নির্বাচিত হন। এগুলো হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এবং জাতিসংঘে সর্বোচ্চ সেনা ও অর্থ প্রদানকারী দেশসমূহ।
শান্তি বিনির্মাণ কমিশন প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই বাংলাদেশ এর একনিষ্ঠ ও সক্রিয় সদস্য। কেবল সদস্য হিসেবেই নয়, এর আগেও বাংলাদেশ একাধিকবার কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০১২ এবং ২০২২ সালে বাংলাদেশ কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ এবং ২০২৩ সালেও বাংলাদেশ সফলভাবে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে শীর্ষ সেনা ও পুলিশ প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাঠপর্যায়ের এ অবদানের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পিবিসির সহসভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের এ অবস্থান বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশটির দ্বিমুখী সক্ষমতাকে ফুটিয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এ দায়িত্ব গ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ তার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
জাতিসংঘের এ শীর্ষপদে বাংলাদেশের পুনঃনির্বাচিত হওয়া দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে ঢাকার অবস্থানকে সুসংহত করল। শান্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের যে দীর্ঘদিনের লড়াই, জাতিসংঘের সদর দপ্তরে লাল-সবুজ পতাকার এ জয়গান যেন তারই এক সার্থক রূপায়ণ।