নিজস্ব প্রতিবেদক:: রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আজ রোববার সকালে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার করার সক্ষমতা এবং উদ্যম দুটোই এখন শেষ পর্যায়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের যতটুকু সংস্কার করার সুযোগ ছিল, যেটুকু বিচার করার ক্ষমতা ছিল ওনাদের দম এখন ফুরিয়ে গেছে। ওনাদের সক্ষমতা এখন শেষ সীমায়।”
রোববার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এভাবেই সরকারের বর্তমান অবস্থার নির্মোহ মূল্যায়ন করলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
‘অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারের কর্মকাণ্ড ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কাজের অমিল নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? ছাতা তো খুললই না, বরং মানুষ বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাচ্ছে। কথার সঙ্গে কাজের এই দূরত্ব কাম্য নয়।
অনুষ্ঠানে সিজিএস-এর পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিয়ে একটি বিশেষ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশের ৫০৫ জন সংখ্যালঘু নাগরিকের ওপর চালানো এই জরিপে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। ৫০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু উত্তরদাতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ২৫ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের অনিরাপদ বা চরম অনিরাপদ মনে করছেন।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পিছিয়ে পড়া এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ভোটের মাঠে আনা এবং নির্বাচনের আগে-পরে তাঁদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনকে পর্যাপ্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। নারী, সংখ্যালঘু এবং ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এখনো সুযোগ রয়েছে। তিনি মনে করেন, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে পারাই হবে এই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বর্তমান সরকারের বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখন ওনারা যেটা করতে পারেন, তা হলো একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া। এটিই হবে এই সরকারের সামনে ভালো কাজ করার শেষ সুযোগ। যদি তারা এই শেষ কাজটি সফলভাবে করতে পারে, তবেই ইতিহাসের পাতায় তাদের জন্য কিছুটা জায়গা মিলতে পারে।
সেমিনারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহানও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান। বক্তারা সবাই একমত হন যে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়িয়ে দিল। সংস্কারের 'দম ফুরিয়ে যাওয়া'র এই তত্ত্ব রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের এই ‘শেষ সুযোগ’টি কীভাবে ব্যবহার করে এবং একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হয় কি না।