ডেস্ক:: দেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কর আদায়ের পরিধি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে জানান, অর্থনীতির ক্ষত সারাতে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সেই অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় একটি প্রস্তাবিত সরকারি হাসপাতালের ভূমি পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি রূপরেখা প্রদান করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা একটি কঠিন অর্থনৈতিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। কর বা ট্যাক্স বাড়ানো মানে কেবল সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা চাপানো নয়, বরং করের আওতা বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রের আয় নিশ্চিত করা, যাতে সেই অর্থ দিয়ে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী আরও জানান, উচ্চবিত্ত ও সক্ষম করদাতাদের করজালের আওতায় আনা এবং কর ফাঁকি রোধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়লে সরকারের পক্ষে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি মনে করেন, কেবল সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে একটি দেশের অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়, এর জন্য দেশি ও বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান অসম্ভব। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি দেশে নতুন বিনিয়োগ না আসে, তবে শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে কাজ করছে যেখানে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আশ্বস্ত বোধ করেন। আগামী বাজেটের মূল ফোকাস থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান। এই তিন খাতের সমন্বিত উন্নয়নই হবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিন বিকেল ৩টায় মন্ত্রী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানাধীন জেলেপাড়া এলাকায় প্রস্তাবিত সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। স্বাস্থ্যসেবাকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে এই বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বানৌজা উল্কার আবাদ অঞ্চল-২-এর পশ্চিম পাশে এবং মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন মুসলিমাবাদ এলাকায় উপস্থিত হন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধিগ্রহণকৃত মোট ১৪.২১৯০ একর এবং আরও ২.৭ একর জমি হাসপাতালের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
পতেঙ্গা ও তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে, যা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের চিকিৎসা সেবায় বিপ্লব ঘটাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সঙ্গে নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমি সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে নির্মাণ কাজ শুরুর নির্দেশনা দেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী বাজেটে সরকার কঠোর কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। একদিকে কর বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি, এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমরা শুধু গালভরা উন্নয়নের বুলি আওড়াতে চাই না। আমরা চাই তৃণমূলের মানুষের হাতে কাজ থাকুক, তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হোক এবং আমাদের অর্থনীতি নিজের পায়ে দাঁড়াক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পতেঙ্গা এলাকায় একটি বড় মাপের সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের খবর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পতেঙ্গা ও এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী যারা উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরের মূল কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই হাসপাতালটি হবে আশীর্বাদস্বরূপ।
অন্যদিকে কর বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, কর ব্যবস্থার সংস্কার হবে জনবান্ধব এবং উন্নয়নের স্বার্থে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর চট্টগ্রাম সফরটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি যেমন অর্থনৈতিক সংস্কারের কঠিন বার্তা দিয়েছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নিজের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, আগামী বাজেটে এই পরিকল্পনার কতটা বাস্তব প্রতিফলন ঘটে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।