আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আতঙ্কের কালো মেঘে ঢাকা। আজ শনিবার দুপুরে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে শুরু হয়েছে ইরানের পাল্টা প্রতিশোধ। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি শুরু করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে ছোড়া অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। এই মুহূর্তে ইসরায়েল জুড়ে যুদ্ধের সাইরেন বাজছে এবং লাখ লাখ মানুষ ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছে।
টাইমস অব ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইসরায়েল থেকে শুরু করে মধ্য ইসরায়েল পর্যন্ত প্রতিটি প্রান্তে সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শনাক্ত হওয়ার পরপরই আইডিএফ সাধারণ জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সাধারণ জনগণকে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী হুমকি প্রতিহত করতে কাজ করছে। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অভেদ্য বা শতভাগ নিরাপদ নয় । ইরানে যৌথ হামলার পর তেহরান যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা আগেই স্পষ্ট করেছিলেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা।
ইরান সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক চরম হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম! এখন তোমরা এমন একটি ধ্বংসাত্মক পথে যাত্রা শুরু করেছ, যার ইতি টানা আর তোমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।বিশ্লেষকদের মতে, আজিজির এই বার্তাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরান কেবল একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নয়, বরং ইসরায়েলের কৌশলগত ও জনবহুল স্থাপনাগুলোকেও তাদের পাল্টা হামলার আওতায় নিয়ে এসেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের মাল্টি-লেয়ারড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তেহরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাঝ আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টা করছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। আকাশজুড়ে এখন কমলা রঙের আলোর ঝিলিক আর বিস্ফোরণের শব্দ। ইসরায়েলি সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং ইরানে দ্বিতীয় দফায় আঘাত হানার জন্য তাদের যুদ্ধবিমানগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আজ সকালে তেহরানের অতি-সুরক্ষিত পাস্তুর জেলায় যেখানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ নেতার বাসভবন অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে দফায় দফায় বিস্ফোরণ ঘটে। যদিও ইরানি গণমাধ্যম দাবি করেছে যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদ আছেন, কিন্তু এই হামলাকে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবে দেখছে ইরান। এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান।
ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা এখন নিরাপদ কক্ষ (Safe Room) বা বাঙ্কারে অবস্থান করছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্যদিকে, তেহরানসহ ইরানের পাঁচটি প্রধান শহরে বিস্ফোরণের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হওয়া এই পাল্টা হামলা বিশ্ববাসীকে এক মহা-সংকটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউস পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই জানিয়েছেন, ইরানের হুমকি বন্ধ করাই তাদের লক্ষ্য। তবে ইরানের এই পাল্টা আঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে আরও কতটা সক্রিয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এটি আর কেবল আকাশপথে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে, তেহরান তাদের সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, ইসরায়েল যদি আবারও পাল্টা জবাব দেয়, তবে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরাকের মাটি ব্যবহার করে যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। তেলের বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে অপূরণীয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। একদিকে তেহরানের দগ্ধ স্থাপনা, অন্যদিকে ইসরায়েলের আকাশে ধেয়ে আসা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সব মিলিয়ে পৃথিবী এক অনাকাঙ্ক্ষিত মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। শান্তি নয়, বরং আগুনের ভাষায় কথা বলছে দুই পক্ষ।