আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ২০২৬ সালের ৭ মার্চ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, তখন বিশ্ব রাজনীতির দুই মেরু থেকে ভেসে এল দুই চরম বিপরীতমুখী হুঙ্কার। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি এবং অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অদম্য ঘোষণা যে ইরান কখনও মাথা নত করবে না।
সংঘাতের অষ্টম দিনে এসে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের এই বাগযুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত এখনই থামার কোনো লক্ষণ নেই। ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী লড়াই আজ অষ্টম দিনে পা রাখল।
গত এক সপ্তাহের ধ্বংসলীলা আর লাশের মিছিলের পর যখন বিশ্ববাসী একটি যুদ্ধবিরতির প্রত্যাশা করছিল, ঠিক তখনই কূটনৈতিক পথগুলোকে আরও জটিল করে তুলল দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান এখন যেকোনো সামরিক চাপ মোকাবিলায় চূড়ান্ত প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
শনিবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে তাঁর দেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ইরান একটি স্বাধীন দেশ এবং এর জনগণ কখনও কারো কাছে দাসত্ব স্বীকার করবে না। আমরা কোনো সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না।
ইহুদিবাদী শাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই নগ্ন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। পেজেশকিয়ান তাঁর বার্তায় ইরানের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন যে যদি এই হামলা অব্যাহত থাকে, তবে যুদ্ধের দাবানল পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং এর পরিণতির জন্য দায়ী থাকবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইরানকে উদ্দেশ্য করে চরম অপমানজনক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। ট্রাম্প কেবল আত্মসমর্পণের দাবিই জানাননি, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন।
ট্রাম্পের দাবি হলো ইরানকে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত থাকবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া কোনো নতুন নেতা নির্বাচন করা হলে তা ওয়াশিংটন গ্রহণ করবে না বলেও তিনি জানান। ট্রাম্পের এই রেজিম চেঞ্জ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের হুমকি তেহরানকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলেছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
অষ্টম দিনেও যুদ্ধের তীব্রতা কমেনি। ইরান আজ আবারও ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের এই পাল্টা হামলা ওয়াশিংটনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত বিমান হামলা ইরানের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো ও বিমানবন্দরের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। কিন্তু পেজেশকিয়ানের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের সামরিক কমান্ড এখনও কার্যকর এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
বর্তমান এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার সব প্রচেষ্টাই প্রায় স্থগিত হয়ে পড়েছে। চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে শান্তি আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং ইরানের প্রতিরোধের শপথ, এই দুই অনড় অবস্থান কূটনীতিকে অকেজো করে দিয়েছে। আরব দেশগুলোও এখন নতুন করে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে কারণ যুদ্ধের বিস্তৃতি তাদের তেলক্ষেত্র ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ কেবল দুটি ভূখণ্ডের লড়াই নয়, এটি এখন দুই আদর্শের চরম সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে একটি অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছেন, মাসুদ পেজেশকিয়ান তখন জাতীয়তাবোধ আর ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সেই স্বপ্নকে নস্যাৎ করতে চাইছেন। অষ্টম দিনের এই উত্তেজনা প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে ফিরে আসার পথ প্রতিদিন আরও সংকুচিত হচ্ছে। বারুদের গন্ধ মাখা এই মার্চ মাস শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎ।