আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমায় তেহরানে আল-কুদস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মিছিলে অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ ইরানি। দেশটির সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলার মধ্যেই এ কর্মসূচি পালিত হলো। ছবি: রয়টার্স
ইরানের আকাশ যখন ইসরায়েলি বোমারু বিমানের গর্জনে প্রকম্পিত, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশটির রাজপথ দখল করেছে লাখ লাখ মানুষ। পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমায় পালিত আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস উপলক্ষে শুক্রবার ইরানজুড়ে এক নজিরবিহীন জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছে।
একদিকে ফিলিস্তিনের মুক্তির ডাক, অন্যদিকে যুদ্ধাবস্থায় নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির প্রতি সংহতি প্রকাশ, সব মিলিয়ে তেহরান আজ এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যখন তেহরানে বড় ধরনের হামলার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে, ঠিক তখনই ইরানের রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে নেমে এসেছে মানুষের ঢল। তেহরান, ইসফাহান, মাশহাদ এবং জাহেদানের মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি।
যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইরানি জনগণের এই মনোবল বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ইসরায়েল নিপাত যাক স্লোগানের পাশাপাশি তাদের নতুন নেতার প্রতি অবিচল আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন।
বিশাল এই গণজমায়েতের সমান্তরালে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক চরম সতর্কবার্তা জারি করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে কোনো ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন কোনো বিক্ষোভ দমনে গত জানুয়ারির চেয়েও আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারিতে হওয়া বিক্ষোভে প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার জন্য ইরান কর্তৃপক্ষ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীদের দায়ী করে আসছে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, সেই সময় নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়ে বিক্ষোভ দমন করেছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানি জনগণকে তাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে রাজপথে নামার আহ্বান জানাচ্ছেন, ঠিক তখনই মোজতবা খামেনি তাঁর প্রথম ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত, তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে রণাঙ্গনে আহত বীর হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেই ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের এই কঠোর অবস্থান মূলত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের একটি আগাম প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আজকের কুদস দিবসের প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানেও রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছে। ওমানের সোহর শিল্প এলাকায় ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে ২ জন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। দুবাইয়ের আকাশে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে এবং কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোনের আঘাতে জ্বালানি ট্যাংকে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ইরাকের কুর্দিস্তানে ড্রোন হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ।
ইরান যুদ্ধ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ইরানের তৈরি করা অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তেলের দাম ইতিমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব এভিয়েশন সেক্টরে ধস নামিয়েছে। ২০২৬ সালের এই আল-কুদস দিবস ইরানের জন্য কেবল একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দমনের হুমকি, ইরান এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে। মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান কি এই যুদ্ধ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিমজ্জিত হবে, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে।