আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আর আকাশচুম্বী তেলের দামের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে হোয়াইট হাউস।
মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকো-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধ গুটিয়ে নিতে ইসরায়েলকে মাত্র এক সপ্তাহের সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের এই হঠাৎ কঠোর অবস্থানের পেছনে সামরিক সাফল্যের চেয়েও বিশ্ব অর্থনীতির ধস নামার আশঙ্কাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত ফাটল ক্রমেই বাড়ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করছেন, তাঁদের সামরিক অভিযান বড় ধরনের লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তবে পেন্টাগন ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ ভিন্ন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাঁদের যুক্তি হলো শাসনব্যবস্থা বদলাতে হলে হয় দেশজুড়ে বিশাল গণবিক্ষোভ প্রয়োজন, না হয় সরাসরি বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে হবে। যার কোনোটিরই বাস্তব লক্ষণ আপাতত নেই। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। পলিটিকোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে এর অর্থনৈতিক ফলাফল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো গভীর পর্যালোচনা (Deep Review) করেনি। ফলে মার্কিন ভূখণ্ডে রেকর্ড তেল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধের প্রভাবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম অন্তত ৬০ সেন্ট বেড়ে গেছে।
ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণায় যে ‘সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এখন সেই প্রতিশ্রুতিকে ম্লান করে দিচ্ছে। সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন যুদ্ধ থামানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও বাজার শান্ত হয়নি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ অস্ত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুত থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় তেলের মজুত অবমুক্ত করার ঘটনা, যা নির্দেশ করে যে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।
ইসরায়েলকে দেওয়া এই এক সপ্তাহের আলটিমেটাম কেবল একটি সময়সীমা নয়, এটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির একটি প্রতিফলন। তেহরানের শাসন বদলানোর দীর্ঘ মেয়াদী স্বপ্নের চেয়েও ওয়াশিংটনের কাছে এখন তেলের দাম কমানো এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী সাত দিন নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কোনো পথ খুলবে, নাকি তেলের আগুনের উত্তাপে পুড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি।