
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে আগুনের শিখা আরও উসকে দিয়েছে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানির গুপ্তহত্যা। ইরানের এই শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাকে ইসরায়েলি হামলায় হত্যার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন এই হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের এই বিবৃতি তেহরানের প্রতি বেইজিংয়ের নিরঙ্কুশ সমর্থনের এক বলিষ্ঠ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী ভাষায় এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীন সব সময় সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা আগ্রাসনের বিরোধিতা করে আসছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় নেতাদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নগ্ন হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করার এক হীন প্রচেষ্টা।’
চীনের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, বেইজিং কেবল একটি আঞ্চলিক পক্ষ হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘টার্গেটেড কিলিং’ পলিসির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আলী লারিজানি কেবল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সামরিক রণকৌশলের মূল কারিগর।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের বর্তমান যে কৌশলগত সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, তার পেছনে লারিজানির অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির নীতিনির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রধান। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া মানে ইরানের সামরিক কাঠামোতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করা, যা ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল।
লারিজানি হত্যাকাণ্ডের পর ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (IRGC) জানিয়েছে, লারিজানির রক্তের প্রতিটি ফোঁটার হিসাব নেওয়া হবে।
কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলাগুলো মূলত এই হত্যাকাণ্ডেরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া বলে মনে করছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক।
লারিজানিকে হত্যার ঘটনায় রাশিয়ার পর এখন চীনের এই সরাসরি নিন্দা প্রকাশ প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে বেইজিং আর পর্দার আড়ালে থাকতে চাইছে না।
ইরানের ওপর এই নগ্ন হামলার প্রতিবাদে চীন ও ইরান তাদের অর্থনৈতিক জোট আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে পেট্রো-ইউয়ানে তেল লেনদেনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা আরও ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের এই কড়া বিবৃতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি প্রচ্ছন্ন সতর্কতা যে, তেহরানের ওপর আর কোনো বড় ধরনের হামলা চীন মুখ বুজে সহ্য করবে না।
লারিজানি এবং বাসিজ প্রধান সোলাইমানির জানাজা আজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই জানাজা থেকে ইরানের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা ইরানের ‘কমান্ড সেন্টার’ ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু চীনের মতো দেশের প্রতিবাদ ইসরায়েলের এই সামরিক সাফল্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
১৯ মার্চ ২০২৬-এর এই প্রেক্ষাপটে লিন জিয়ানের বক্তব্য কেবল একটি নিন্দা প্রস্তাব নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন। চীন পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে একতরফা সামরিক আধিপত্য আর চলবে না। লারিজানি হত্যাকাণ্ড কেবল ইরানের ক্ষতি নয়, এটি বেইজিংয়ের কৌশলগত অংশীদারত্বের ওপরও এক বড় আঘাত। এখন দেখার বিষয়, চীনের এই নৈতিক সমর্থনের পর ইরান মাঠপর্যায়ে কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, সিনহুয়া এবং তেহরান টাইমস।
Leave a Reply