নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাঙালির ইতিহাসে ২৬ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির জন্মমুহূর্ত, শৃঙ্খল ভাঙার গান এবং রক্ত দিয়ে লেখা এক অমর মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল মুক্তির আকুলতায়।
হাজার বছরের পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে একটি স্বাধীন মানচিত্র আর লাল-সবুজের পতাকার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণপণ যুদ্ধে।
আজ আমরা যখন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিই, তখন সেই অকুতোভয় বীরদের আত্মত্যাগ আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নত করিয়ে দেয়।
পটভূমি: বঞ্চনা থেকে বিদ্রোহ
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম শোষণ ও বৈষম্য। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি ধাপে বাঙালি তার অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও যখন আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা শুরু হলো, তখনই বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছিল রক্ত ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।
কালরাত ও প্রতিরোধের শুরু
২৫শে মার্চ মধ্যরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালায়, তখনই শুরু হয় চূড়ান্ত প্রতিরোধ। তৎকালীন জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন।
সেই ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা অর্থাৎ বাংলার 'দামাল ছেলেরা' অস্ত্র হাতে তুলে নেয়।
দামাল ছেলেদের বীরত্ব: রণাঙ্গনের চালচিত্র
বাংলার দামাল ছেলেরা কোনো পেশাদার প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে তুলেছিল 'মুক্তিবাহিনী'। তারা জানত তাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই, কিন্তু তাদের বুকে ছিল অদম্য সাহস।
ছাত্র সমাজের ভূমিকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা কলম ছেড়ে অস্ত্র ধরেছিল। তারা হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি
গেরিলা যুদ্ধ: আমাদের দামাল ছেলেরা দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে তুলেছিল প্রতিরোধের দুর্গ। 'হিট অ্যান্ড রান' পদ্ধতিতে তারা শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীকে নাজেহাল করে দিয়েছিল। বর্ষার কর্দমাক্ত পথ আর নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে তারা যে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছে, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে বিস্ময় হয়ে আছে।
সাধারণ মানুষের ত্যাগ: বাংলার মায়েরা তাদের ছেলেদের হাসিমুখে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, বোনেরা কাজ করেছেন সেবিকা হিসেবে, আর সাধারণ মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন।
রক্তে কেনা লাল-সবুজ
স্বাধীনতা অর্জনের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলেছিল এক অসম লড়াই। বাংলার দামাল ছেলেরা যখন রণাঙ্গনে লড়াই করছিল, তখন পাকিস্তানি সেনারা ও তাদের এদেশীয় দোসররা চালিয়েছিল নির্মম গণহত্যা। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা।
প্রতিটি ইঞ্চি মাটি রঞ্জিত হয়েছে বাংলার দামাল ছেলেদের রক্তে। বীরশ্রেষ্ঠদের থেকে শুরু করে নাম না জানা লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগই আজ আমাদের অহংকার।
২৬ মার্চের তাৎপর্য
২৬ মার্চ আমাদের আত্মপরিচয় খোঁজার দিন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাঙালি জাতি বীরের জাতি। তারা মাথা নত করতে জানে না। দামাল ছেলেরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ন্যায়ের পথে লড়াই করলে জয় সুনিশ্চিত।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু এই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমাদের দামাল ছেলেরা যে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য প্রাণ দিয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলাই হবে শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আগামীকাল ২৬ মার্চ। আসুন, আমরা সেই বীর সন্তানদের স্মরণ করি যারা তাদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের একটি দেশ উপহার দিয়েছেন। তাদের সাহস আমাদের পথ চলার প্রেরণা হয়ে থাকুক। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে জন্ম নিক দেশপ্রেমিক দামাল ছেলে, যারা যেকোনো সংকটে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে লাল-সবুজের পতাকার তলে।