নিজস্ব প্রতিবেদক:: সারাদেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মুনাফালোভী চক্র মেতে উঠেছে বিপজ্জনক খেলায়। তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার পাশাপাশি, এখন নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই বসতবাড়ি, মুদিদোকান, এমনকি গোয়ালঘরেও মজুত করা হচ্ছে শত শত লিটার দাহ্য পেট্রল ও ডিজেল।
গত কয়েক দিনে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, জামালপুর এবং কুড়িগ্রামে প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানে বেরিয়ে এসেছে এমন সব পিলে চমকানো তথ্য।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার জামগড়া মোড় এলাকায় সাধারণ এক মুদিদোকানি শাহজালালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছে প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার রাতে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত শাহজালালের বাড়ির একটি ঘর থেকে ৯টি বিশালাকার গ্যালনে ভরা ৩৭০ লিটার পেট্রল উদ্ধার করে।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে মুদিদোকানির বাড়িতে মজুত করা ৩৭০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করে প্রশাসন। গতকাল শুক্রবার রাতের ছবি
তদন্তে দেখা যায়, মুদি ব্যবসার আড়ালে শাহজালাল অবৈধভাবে তেল মজুত করে আসছিলেন। সাধারণ ক্রেতারা তেল না পেয়ে ফিরে গেলেও তিনি গোপনে চড়া দামে এই তেল বিক্রি করতেন। অভিযানের সময় শাহজালাল পালিয়ে গেলেও প্রশাসন দাহ্য তেলগুলো জব্দ করে সরকারি কোষাগারে বিক্রির ব্যবস্থা করেছে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজারে গতকাল সন্ধ্যায় চালানো এক অভিযানে ৮০০ লিটার অবৈধভাবে মজুত করা পেট্রল জব্দ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী এনায়েতুর রহমান কোনো প্রকার বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই নিজের গুদামঘরে ড্রামভর্তি পেট্রল জমিয়ে রেখেছিলেন। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তিনি খুচরা পর্যায়ে চড়া মূল্যে এগুলো বিক্রি করতেন। ইউএনও মো. রিফাতুল ইসলামের আদালত এনায়েতুরকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে এবং জব্দকৃত তেল আজ শনিবার প্রকাশ্যে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছেন।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার সীমান্ত এলাকায় রাতের অন্ধকারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করার সময় হাতেনাতে তিনজনকে ধরেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদ জানান, শাহিনুর ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণকে ২ হাজার টাকা জরিমানার পাশাপাশি ৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাহাঙ্গীর আলম ও ইয়ানুস সিয়াম নামের আরও দুজনকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তারা মূলত পার্বতীপুর থেকে জারকেনে করে তেল এনে সীমান্ত এলাকায় পাচারের উদ্দেশ্যে বা বেশি দামে বিক্রির জন্য মজুত করতেন। শাহিনুর ইতিপূর্বেও একই অপরাধে জরিমানা গুনেছেন বলে জানা গেছে।
আজ শনিবার দুপুরে জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকায় ‘জুই এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি তেল বিপণন কেন্দ্রে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মোটরসাইকেল চালকেরা তেল কিনতে গিয়ে ‘তেল নেই’ শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জামালপুরে তেল না পেয়ে মোটরসাইকেলের চালকেরা জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। আজ শনিবার দুপুরে জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকায়।
খবর পেয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ ও পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দোকানের রেজিস্টার পরীক্ষা করেন। কাগজে তেল নেই লেখা থাকলেও দোকানের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ লিটার তেলের গোপন মজুত পাওয়া যায়। এই কৃত্রিম সংকট তৈরির দায়ে দোকানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাৎক্ষণিকভাবে অপেক্ষমাণ গ্রাহকদের কাছে তেল বিক্রি শুরু করা হয়।
জ্বালানি তেল মজুতের সবচেয়ে অদ্ভুত চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায়। দাঁতভাঙা ইউনিয়নের একটি বাড়িতে গোয়ালঘরের ভেতরে গরুর পাশাপাশি সারি সারি ড্রামভর্তি পেট্রল রাখা হয়েছিল। এসিল্যান্ড রাফিউর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে এই অবৈধ মজুত ধরা পড়ে। বিপজ্জনকভাবে দাহ্য পদার্থ মজুত রাখায় সংশ্লিষ্ট পরিবারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যদিও পরিবারের দাবি ছিল তারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তেল রেখেছেন, তবে প্রশাসনের মতে মজুতের পরিমাণ ছিল বাণিজ্যিক পর্যায়ের।
পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ অনুযায়ী এভাবে যত্রতত্র তেল মজুত করা কেবল দণ্ডনীয় অপরাধই নয়, বরং মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে:
নিরাপত্তা ঝুঁকি: বসতবাড়ি বা জনাকীর্ণ বাজারে এভাবে তেল মজুত রাখলে যে কোনো ছোট দুর্ঘটনা থেকে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
কৃত্রিম সংকট: মজুতদারদের কারণে বাজারে তেলের সরবরাহ কমছে, যা পরিবহন ও কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভিযান অব্যাহত: প্রতিটি জেলায় প্রশাসনের বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে যারা নিয়মিত হাট-বাজার এবং সন্দেহভাজন গুদামগুলোতে নজরদারি চালাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এই সংকট মূলত যতটা না সরবরাহের অভাব, তার চেয়ে বেশি ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। যখন সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে ঘরে রাখছেন এবং ব্যবসায়ীরা তা গুদামজাত করছেন, তখন সংকটের মাত্রা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ময়মনসিংহের শোয়ার ঘর থেকে কুড়িগ্রামের গোয়ালঘর সর্বত্রই এখন তেলের যে মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে, তা দমনে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অতি মুনাফার লোভ যেন কোনো বড় ট্র্যাজেডির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেই এখন সবার তীক্ষ্ণ নজর।