আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে-বাতাসে এখন একটাই স্লোগান ‘নো কিংস’ (কোনো রাজা নয়)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসি অভিবাসন নীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধংদেহী অবস্থান এবং স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পালিত হয়েছে স্মরণকালের বৃহত্তম বিক্ষোভ।
দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০-এর বেশি স্থানে একযোগে রাজপথে নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। আয়োজকদের মতে, এটি আমেরিকার ইতিহাসে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে এক নতুন মাইলফলক।
বিক্ষোভকারীরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতি মার্কিন গণতন্ত্রের চিরাচরিত কাঠামো ভেঙে এক ধরনের ‘রাজতন্ত্র’ বা ‘স্বৈরতন্ত্রের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টার প্রতিবাদে এই আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নো কিংস’। শনিবার ছিল এই কর্মসূচির তৃতীয় দফার আয়োজন, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। ২৮ মার্চ ২০২৬, ওয়াশিংটন: রয়টার্স
এবারের বিক্ষোভের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিস্তৃতি। কেবল নিউ ইয়র্ক বা ওয়াশিংটনের মতো বড় শহর নয়, দুই-তৃতীয়াংশ মিছিল আয়োজিত হয়েছে ছোট ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায়। আয়োজকদের দাবি, গত বছরের জুনে শুরু হওয়া প্রথম বিক্ষোভের তুলনায় ছোট শহরগুলোতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিউ ইয়র্ক: ম্যানহাটানে প্রায় এক লাখ মানুষ মিছিলে অংশ নেন। হলিউড কিংবদন্তি রবার্ট ডি নিরো এই সমাবেশের অগ্রভাগে ছিলেন। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে এতটা অস্তিত্বের সংকটে ফেলেননি।
মিনেসোটা: সেন্ট পলে আয়োজিত বিশাল মিছিলে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির কড়া সমালোচনা করা হয়। সেখানে ফেডারেল কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ছবি সংবলিত পোস্টার হাতে হাজারো মানুষকে কাঁদতে দেখা গেছে।
ওয়াশিংটন ডিসি: ন্যাশনাল মলে সমবেত বিক্ষোভকারীরা গণতন্ত্রের সমর্থনে স্লোগান দেন। মেরি ল্যান্ড থেকে আসা একদল প্রবীণ নাগরিক হুইলচেয়ারে বসে প্রতিবাদে অংশ নিয়ে নজর কাড়েন। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’।
বিক্ষোভ সমাবেশে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালৎস বলেন, আমরা মানবিকতা, শালীনতা এবং গণতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব, তা করতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করব না। প্রবীণ রাজনীতিক ও ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স যোগ করেন, আমরা এই দেশকে অলিগার্ক বা স্বৈরাচারদের হাতে তুলে দিতে পারি না। এখানে জনগণের শাসন থাকবেই।
ট্রাম্পবিরোধী ‘নো কিংস’ বিক্ষোভে নেমেছেন বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো। তাঁর সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেতিশিয়া জেমস, প্রবীণ রাজনীতিক আল শার্পটন প্রমুখ। ২৮ মার্চ ২০২৬, নিউইয়র্ক:রয়টার্স
বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কিছু জায়গায় তা সহিংস রূপ নেয়। বিশেষ করে ওরেগন ও ক্যালিফোর্নিয়ায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
লস অ্যাঞ্জেলেস: ফেডারেল কারাগার এলাকায় বিক্ষোভকারীরা বেষ্টনী ভেঙে ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়।
ওরেগন: এখানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) অফিসের বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যানের ওপর ‘প্রতিরোধ’ স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড সেঁটে দেন বিক্ষোভকারীরা।
ডালাস: টেক্সাসের এই শহরে ট্রাম্প সমর্থকদের সঙ্গে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভকারীদের হাতাহাতি ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৫৪ বছর বয়সী হলি বেমিস বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা রাজাদের শাসনের বিরুদ্ধে লড়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। আজ আমরা আবার সেই একই কাজ করছি। আমরা কোনো রাজার শাসন মেনে নেব না। অবসরপ্রাপ্ত নারী টেরেসা গানেরের মতে, ট্রাম্প যা করছেন তার লক্ষ্য কেবল নিজেকে ধনী করা এবং সাধারণ মার্কিনিদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার ‘দাঙ্গাকারী’ একটি ফেডারেল ভবন ঘিরে রাখলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। ফেডারেল কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, পুলিশ উস্কানি ছাড়াই কাঁদানে গ্যাস ও শক্তি প্রয়োগ করেছে।
শনিবারের এই বিক্ষোভ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতি নিয়ে মার্কিনিদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমা হয়েছে, ‘নো কিংস’ আন্দোলন তারই বহিঃপ্রকাশ। আমেরিকার গণতন্ত্র কি এই ‘রাজতান্ত্রিক’ প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে পারবে, নাকি বিভাজন আরও গভীর হবে সেই প্রশ্নই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে।