ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে 'প্রতিরোধ অক্ষ' বা 'রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট' দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো যে দাবি করে আসছে, তাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা 'খাতাম-আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স'-এর কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আব্দোল্লাহি এক হুঙ্কারে জানিয়েছেন, এই জোট আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, সংহত এবং কৌশলী হয়ে ময়দানে আবির্ভূত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইরানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জেনারেল আব্দোল্লাহির এই বক্তব্যটি প্রকাশ করে, যেখানে তিনি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে 'ভুল' বলে অভিহিত করেছেন।
বুধবার এক সামরিক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে মেজর জেনারেল আব্দোল্লাহি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে এই প্রচার চালিয়ে আসছে যে, ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্ট সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তাদের ধারণা ছিল, ধারাবাহিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার ফলে হিজবুল্লাহ বা আনসারুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো পিছু হটবে।
কিন্তু জেনারেল আব্দোল্লাহির দাবি অনুযায়ী, বাস্তবতা এর ঠিক উল্টো। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শত্রুরা ভেবেছিল তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু তারা এখন এমন এক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে যা তাদের কল্পনাকেও হার মানায়। প্রতিরোধ ফ্রন্ট এখন কেবল রক্ষণাত্মক নয়, বরং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার মতো আক্রমণাত্মক সক্ষমতা অর্জন করেছে।
জেনারেল আব্দোল্লাহি তার বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার অভূতপূর্ব সমন্বয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি একে কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং 'ঈমান ও সাহসের বন্ধন' হিসেবে চিত্রিত করেন।
তার বিশ্লেষণে উঠে আসা প্রধান শক্তিগুলো হলো- ইসরাইলি সীমান্তের উত্তরাঞ্চলে যারা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে ও
লোহিত সাগরসহ কৌশলগত জলপথগুলোতে যাদের প্রভাব বিশ্বশক্তিগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। যারা ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন উপস্থিতির বিরুদ্ধে অবিচল অবস্থান নিয়েছে।
ইরানি এই কমান্ডারের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়। তারা ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে এমন এক নিখুঁত সমন্বয়ে কাজ করছে, যা মার্কিন নেতৃত্বাধীন যেকোনো সামরিক পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম।
জেনারেল আব্দোল্লাহি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলি শাসনব্যবস্থা এখন বুঝতে শুরু করেছে যে তারা এই ফ্রন্টকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে অক্ষম। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তির চেয়েও 'জিহাদি চেতনা' এবং 'দৃঢ় অবস্থান' এই জোটকে অপরাজেয় করে তুলেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমাদের সামনে কেবল একটি পথই খোলা আছে আর তা হলো এই শক্তিশালী ফ্রন্টের বাস্তবতা মেনে নেওয়া এবং নতি স্বীকার করা। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশী শক্তির খবরদারি করার দিন শেষ হয়ে আসছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি যোদ্ধাদের আদর্শিক ও নৈতিক অবস্থানের ওপরও আলোকপাত করেন এই শীর্ষ কমান্ডার। তিনি লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরাকের যোদ্ধাদের দেশপ্রেম ও ত্যাগের প্রশংসা করেন। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি এই যোদ্ধাদের ধারাবাহিক বিজয় এবং উত্তরোত্তর সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের এই সময়ে জেনারেল আব্দোল্লাহির এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে, আঞ্চলিক অস্থিরতা সত্ত্বেও তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা মিত্রবাহিনীগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সজ্জিত এবং যেকোনো বড় ধরনের সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত।
জেনারেল আব্দোল্লাহির এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের মনোযোগ কিছুটা সরিয়ে এশিয়ার দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন ইরানের এই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা ওই অঞ্চলে তেহরানের প্রভাব বলয় আরও সুসংহত হওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।