ডেস্ক:: বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে মোস্তাফিজুর রহমান এক বিস্ময়ের নাম। ২০১৫ সালে অভিষেকের সেই সপ্রতিভ আবির্ভাবের পর থেকে আজ অবধি তিনি বহু রেকর্ডের সাক্ষী হয়েছেন। তবে এবারের সাফল্যটি কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাঁহাতি পেসারদের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক বাংলাদেশের এই ফিজ।
শনিবার লাহোর কালান্দার্সের হয়ে পাকিস্তান সুপার লিগে পিএসএল মুলতান সুলতানসের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন মোস্তাফিজ। আর এই ম্যাচেই তিনি পেছনে ফেলেছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি বাঁহাতি পেসার মোহাম্মদ আমিরকে।
লাহোর স্টেডিয়ামে ১৩ ওভারের সংক্ষিপ্ত ম্যাচে ষষ্ঠ ওভারে প্রথমবার বল হাতে নেন মোস্তাফিজ। সেই সময় তার নামের পাশে মোহাম্মদ আমিরের ৪১৫ উইকেটের রেকর্ড ছোঁয়ার হাতছানি ছিল। নিজের প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই আগ্রাসী ব্যাটসম্যান সাহিবজাদা ফারহানকে সাজঘরে ফিরিয়ে আমিরকে স্পর্শ করেন তিনি। প্রথম ওভারে মাত্র ৫ রান খরচ করে নিজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ধার বজায় রাখেন।
এরপর নিজের তৃতীয় ও শেষ ওভারে বল করতে এসে প্রথম বলে বাউন্ডারি হজম করলেও দমে যাননি মোস্তাফিজ। দ্বিতীয় বলেই ফুলটস ডেলিভারিতে শান মাসুদকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন তিনি। আর এই উইকেটটি পাওয়ার সাথে সাথেই মোহাম্মদ আমিরকে ছাড়িয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাঁহাতি পেসারদের মধ্যে এককভাবে শীর্ষে উঠে যান মোস্তাফিজুর রহমান।
বিশ্ব ক্রিকেটে বাঁহাতি পেসারদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল পাকিস্তানের। ওয়াহাব রিয়াজ, সোহাইল তানভীর কিংবা মোহাম্মদ আমির, সবাই টি-টোয়েন্টি ফেরি করে বেড়িয়েছেন বিশ্বজুড়ে। কিন্তু মোস্তাফিজ সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন অত্যন্ত কম ম্যাচ খেলে। মোস্তাফিজের এই ৪১৬টি উইকেটের মধ্যে ১৫৮টি এসেছে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে। বাকিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের অর্জন।
আমিরের চেয়ে ২৬টি ইনিংস কম খেলেই এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি, যা তার কার্যকারিতারই প্রমাণ দেয়। শীর্ষ ৫ বাঁহাতি পেসারের তালিকায় মোস্তাফিজ ৩২৩ ইনিংসে ৪১৬ উইকেট নিয়ে শীর্ষে আছেন। এরপরই রয়েছেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমির ৩৪৯ ইনিংসে ৪১৫ উইকেট, ওয়াহাব রিয়াজ ৩৪৪ ইনিংসে ৪১৩ উইকেট, সোহাইল তানভীর ৩৮১ ইনিংসে ৩৮৯ উইকেট এবং নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট ৩৫০ এর অধিক ইনিংসে উইকেটের মালিক।
পেসারদের বাইরে যদি কেবল বাঁহাতি বোলার স্পিনারসহ বিবেচনা করা হয়, তবে মোস্তাফিজের ওপরে আছেন কেবল একজন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের পোস্টার বয় সাকিব আল হাসান। সাকিব ৪৬১ ইনিংসে শিকার করেছেন ৫০৭ উইকেট। অর্থাৎ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাঁহাতি বোলারদের তালিকায় প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থানটি এখন দুই বাংলাদেশির দখলে।
অন্যদিকে, ক্রিকেটের এই ফরম্যাটে সব ধরনের বোলারদের মধ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হিসেবে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন আফগান লেগ স্পিনার রশিদ খান। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ৫১৫ ইনিংসে ৭০৩ উইকেট শিকার করে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছেন এই কিংবদন্তি।
মুলতান সুলতানসের বিপক্ষে মোস্তাফিজের ২ উইকেট শিকারের দিন লাহোর কালান্দার্সের ব্যাটিং বিভাগ ছিল বিধ্বংসী মেজাজে। বিশেষ করে দুই টাইগার ওপেনার মোহাম্মদ নাঈম এবং পারভেজ হোসেন ইমন মাঠ মাতিয়েছেন। মোহাম্মদ নাঈম মাত্র ২৮ বলে ৬০ রানের এক টর্নেডো ইনিংস খেলেন। পারভেজ হোসেন ইমন ১৯ বলে ৫টি বিশাল ছক্কায় ৪৫ রান করে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেন। মাত্র ৫ রানের জন্য ফিফটি মিস করলেও তার ইনিংসটি ছিল জয়ের অন্যতম ভিত্তি। আব্দুল্লাহ শফিক শেষ দিকে ১৪ বলে ৩৩ রানের ক্যামিও খেলেন। এই তিন ব্যাটারের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে লাহোর ১৮৫ রানের পাহাড়সম সংগ্রহ পায়। জবাবে মুলতান সুলতানস ২০ রান দূরে থাকতেই থেমে যায়। মোস্তাফিজ তার ৩ ওভারে ৩৭ রান দিলেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ২ উইকেট নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন।
কাটার, স্লোয়ার আর দুর্দান্ত ইয়র্কারে মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। পিএসএলের এই রেকর্ড কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলিং শক্তির এক বড় স্বীকৃতি। বয়স এবং ফিটনেস বিবেচনায় মোস্তাফিজ আরও বেশ কয়েক বছর দাপটের সাথে খেলে যাবেন বলে আশা করা যায়। আমিরের রেকর্ড ভাঙার পর এখন দেখার বিষয়, মোস্তাফিজ তার এই সিংহাসন কত দ্রুত ৫০০ উইকেটের মাইলফলকে নিয়ে যান। বাংলার এই ফিজ এখন কেবল কাটার মাস্টার নন, তিনি এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বাঁহাতি পেসারদের অঘোষিত সম্রাট।