মোঃ জাহিদুল ইসলাম:: হতদরিদ্র এক রিক্সাচালকের ঘরে ১৯৯২ সালের ৪ আগস্ট কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন সুমা। সেই মফস্বল থেকে বাবা-দাদারা অনেক বছর পূর্বে জীবিকার তাগিদে খুলনা শহরে এসেছেন, কিন্তু ভাগ্য তাঁদের কখনো সহায় হয়নি। এমন সময়ে দরিদ্র পরিবারের মাঝে জন্মগ্রহণ করলেও দারিদ্র্যের কষাঘাতে সুমাকে আলোকিত পরিবেশ উপহার দিতে পারেননি তার বাবা-মা। তাই হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সুমাকে একই এলাকার জুলহাস খালাসীর সাথে অল্প বয়সে বিয়ে দেন তাঁর মা-বাবা।
অন্যদিকে স্বামীর সংসারে এসেও দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেননি সুমা। ভাড়ায় চালিত রিক্সা চালক জুলহাসের অবস্থা যেন তার বাবার চেয়েও করুণ। সুমা একজন বুদ্ধিমতী নারী। তিনি এতদিন ধরে দারিদ্র্যের এই কঠিন অবস্থা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু স্বামীর দারিদ্র্যতা ও অন্যের সমালোচনার ভয়ে কোনো নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পাননি।
জুলহাস শিক্ষিত না হলেও তিনি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। রিক্সা চালানোর পাশাপাশি স্ত্রীকে করে দেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান, যেন পরিবারে আর্থিকভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। অবসর সময়ে জুলহাস স্ত্রী সুমাকে সহযোগিতা করেন। এমতাবস্থায় ২০২৫ সালে বেসরকারি মানব উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক-এর ইউপিজি (টচএ) কর্মসূচির কার্যক্রমের আওতায় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন সুমা-জুলহাস দম্পতি।
পূর্বে চায়ের দোকানের অভিজ্ঞতা থাকায় ক্ষুদ্রব্যবসার ওপর ব্র্যাকের এফজিডি: ১৬, খানা: ৩১, নগরপাড়া-২ এর কার্তিককুল, যার সংগঠনের কোড নং: ৫৬৬৭ ও সদস্য নং: ০১ এর আওতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তারা।
পরবর্তীতে সুমা-জুলহাস যুগল নিজেদের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে ব্র্যাক সহায়তা ও অনুদানের ২৫,০০০/= টাকা নিয়ে আবারও চায়ের দোকানটি সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। চায়ের দোকানের সফলতা তাদেরকে মুগ্ধ করে। তারা এখানে থেমে থাকেনি, ব্র্যাক কর্মীর পরামর্শে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণে উদ্যমী হয়। এরই ফলস্বরূপ বসতবাড়িতে মুরগি পালন, চায়ের দোকানে ক্যারাম বোর্ড ক্রয় এবং চায়ের দোকানের পাশাপাশি সবজি বিক্রয়ের আর্থিক পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনার টাইমলাইন অনুযায়ী তিনি ব্যবসায়ের লভ্যাংশ দিয়ে মুরগি ক্রয়, দ্বিতীয়বার ব্র্যাক সহায়তা ও অনুদানের ১০,০০০/= টাকা দিয়ে ক্যারাম বোর্ড এবং স্বামীর আয়ের উদ্বৃত্ত ও নিজেদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে নতুন করে সবজির ব্যবসা শুরু করেছেন। সবজি ব্যবসা শুরু করায় কতিপয় প্রতিবেশীর সমালোচনার সম্মুখিন হন, যেমন- "কিরে সুমা তোর মেয়ে বড় হচ্ছে, তুই এখন সবজি ব্যবসা শুরু করলি?" উত্তর দিতে সুমা'র সময় লাগেনি। তিনি বলেন- "মেয়ে বড় হচ্ছে বলেই তো খরচ বাড়ছে, তাই আয় বাড়ানোর জন্য সবজি ব্যবসা করছি, চুরি তো করছি না।"
সুমার এই ইতিবাচক মনোভাব একদিন তার পরিবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তার ইচ্ছা, দুই মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করা এবং স্কলারশীপের মাধ্যমে বিদেশে শিক্ষা গ্রহণ করানো।
ব্র্যাক কর্মীর পরামর্শে, তার বুদ্ধিমত্তা ও ব্র্যাকের সহায়তা ও অনুদান দিয়ে অল্প সময়ে স্বল্প পুঁজি দিয়ে যেভাবে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তা অন্যদের জন্য উদাহরণস্বরূপ। তিনি তার ভাগ্য পরিবর্তনে ব্র্যাকের এই সহযোগিতাকে 'আলাদ্বীনের চেরাগ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই অল্প সময়ে তার আর্থিক পরিবর্তন এবং সামাজিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা তাকে ও তার পরিবারকে উদ্যমী ও আত্মবিশ্বাসী করেছে। ব্র্যাকের প্রতি চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।