ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম আজ নিশ্চিত করেছেন যে, তার দেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদের পথে রয়েছে। আগামী শনিবার সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এই দলটির এক ঐতিহাসিক বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এই বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও সৌদি আরব পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে।
মোগাদ্দাম তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন, ইরান তাদের প্রস্তাবিত ‘১০ দফা‘দাবিনামার ভিত্তিতে এই আলোচনায় অংশ নেবে। যদিও এই ১০ দফার খুঁটিনাটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
আলোচনার খবর এলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো থমথমে। ইরানি রাষ্ট্রদূতের কণ্ঠেও সেই সংশয়ের সুর স্পষ্ট। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বিমান হামলা অব্যাহত রাখায় কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত বুধবার রাতেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইরানের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তাঁর দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘গুলি বন্ধের’ নির্দেশ দিলেও হিজবুল্লাহ এবং ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি তাদের ‘আঙুল এখনো ট্রিগারেই রয়েছে’। যদি ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান আরও বিধ্বংসী পাল্টা জবাব দেবে।
সদ্য ক্ষমতায় আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা এই সংকটে সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রভাবশালী। একদিকে তিনি দাবি করছেন ইরানে ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জিত হয়েছে, অন্যদিকে ইরানকে হুমকি দিচ্ছেন যে অস্ত্র সরবরাহ না থামালে দেশটিকে এক রাতের মধ্যেই ‘গুঁড়িয়ে’ দেওয়া হবে। এমনকি ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ মুছে ফেলার হুমকির প্রেক্ষিতে পোপ চতুর্দশ লিও-সহ বিশ্বনেতারা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও মেরুকরণ স্পষ্ট। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যুদ্ধবিরতি নষ্ট করাকে ‘বোকামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। শনিবারের ইসলামাবাদ বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য কুশনার এবং উইটকফও অংশ নিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে, যা এই আলোচনাকে এক অনন্য মাত্রা দিচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থাকলেও একপর্যায়ে তা ১১৯ ডলারে উঠেছিল। যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক খবরে বুধবার এক ধাক্কায় দাম ১৬% কমলেও, অনিশ্চয়তার কারণে বৃহস্পতিবার তা পুনরায় ৯৭ ডলারে উঠেছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমে গেছে। প্রায় ৩ হাজার জাহাজ বর্তমানে সাগরে আটকা পড়ে আছে। ইরান ও ওমান ঘোষণা করেছে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এই প্রণালি দিয়ে চলা জাহাজের ওপর বিশেষ ‘টোল’ বা শুল্ক ধার্য করা হবে।
যুদ্ধের ৪০ দিনে প্রাণহানির সংখ্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুধু লেবাননেই নিহতের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে, আহত ৫ হাজারেরও বেশি। সিরিয়া এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। রেড ক্রস এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অনতিবিলম্বে ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। জাপানের বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব মজুত না থাকায় তেলের মূল্যের এই অভিঘাত তাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেন তাদের আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিল? বিশ্লেষকরা মনে করছেন পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও সৌদি আরব উভয় পক্ষের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত কয়েক দিন ধরে তুরস্ক, মিসর এবং সৌদি আরবের সাথে গভীর যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় চীন ও রাশিয়ার পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে, যারা হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন প্রভাব হ্রাসের পক্ষে।সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে?
ট্রাম্পের কঠোর আলটিমেটাম এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে। নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানে হামলা সাময়িক স্থগিত করলেও লেবাননে তাঁর সামরিক অভিযান চলবে। অন্যদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, তারা যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান চায়’।
যদি ইসলামাবাদে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব এবং ট্রাম্পের আলটিমেটামের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের দিকে। শনিবারের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকই ঠিক করে দেবে ২০২৬ সালের পৃথিবীর ভাগ্য কি শান্তি নাকি ধ্বংস।
তথ্যসূত্র: বিবিসি