বেনাপোল প্রতিনিধি:: যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির ঘটনা যেন এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ‘সিন্থেটিক ফেব্রিক্স’ ঘোষণার আড়ালে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস জব্দের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে।
গত রোববার (৫ এপ্রিল) বিকেলে বন্দরের ১৯ নম্বর শেডে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অভিযানে ঘোষিত ২৬০ প্যাকেজের বিপরীতে ২৬৭ প্যাকেজ পণ্য পাওয়া যায়, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ উচ্চ শুল্কের শাড়ি ও থ্রি-পিস লুকানো ছিল। প্রাথমিকভাবে এসব পণ্যের বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ঢাকার ‘নুসরাত ট্রেডিং’ ভারত থেকে সিন্থেটিক ফেব্রিক্স আমদানির ঘোষণা দেয় এবং ‘খাজা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের দায়িত্বে ছিল। তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তারা দেখতে পান, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে। ফেব্রিক্সের আড়ালে লুকানো ছিল বিপুল পরিমাণ উচ্চ শুল্কের পণ্য। বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানান, মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে পণ্যগুলো সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার কাজ চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্যেই উঠে এসেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রতিবার একই ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়লেও কেন তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না? কেন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে এবং কেনই বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেনাপোল বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা নিম্ন শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানি করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এই চক্রের সঙ্গে বন্দরের কিছু শেড ইনচার্জের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। বিশেষ করে ৩৭ নম্বর শেডের ইনচার্জ নুর উদ্দিন লিংকন, ১৫ নম্বর শেডের সন্দ্বীপ, ৪১ নম্বর শেডের রুহুল আমিন এবং সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেনের নাম বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরে ফিরে আসছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত অভিযোগের পরও তারা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই বন্দরে এখন অনিয়মই নিয়ম হয়ে গেছে। একই লোকদের নাম বারবার আসে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এতে করে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেনকে ঘিরে। ব্যবসায়ীদের একাংশ সরাসরি দাবি করছেন, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এত বড় একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, শামীম হোসেন বেনাপোল বন্দরে যোগদানের পর থেকেই মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির প্রবণতা বেড়েছে। একই কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন একই শেডে বহাল রাখা, বদলির আদেশ কার্যকর না করা এবং একাধিক শেডে দায়িত্ব প্রদান এসবের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেসার্স এসটি কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. ইউনুস আলী বলেন, এই অনিয়ম একা কোনো শেড ইনচার্জের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর পেছনে অবশ্যই উচ্চ পর্যায়ের সমর্থন রয়েছে। আমরা বারবার অভিযোগ করছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
আরেকজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার অভিযোগ ওঠার পরও বন্দর পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। তাহলে তার খুঁটির জোর কোথায়? কেন তিনি এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন?
বেনাপোল কাস্টমস সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই প্রায় ১ হাজার ৮শ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। অথচ এই সময়ে আমদানি কমেনি, বরং উচ্চমূল্যের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। সিনিয়র ব্যবসায়িরা বলছেন, পণ্যের মূল্য কম দেখানো, মিথ্যা ঘোষণা এবং ঘুষের মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার কারণেই এই বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে অনিয়মের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত ১৪ মার্চ ‘ব্রেকিং পাউডার’ ঘোষণার আড়ালে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য উদ্ধার করা হয়। ৯ মার্চ ‘ঘাসের বীজ’ ঘোষণার চালান থেকে আমদানি নিষিদ্ধ প্রায় কোটি টাকার পাট বীজ উদ্ধার করা হয়। ১৮ জানুয়ারি মোটরপার্টসের ঘোষণার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় কোটি টাকার পণ্য পাওয়া যায়। এমনকি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকার একটি চালান বন্দরের বাইপাস সড়ক থেকে আটক বিজিবি। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অনিয়মের অংশ।
অভিযোগ রয়েছে, বন্দরে আধুনিক স্ক্যানার থাকা সত্ত্বেও তা নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাগজপত্র যাচাই করেই পণ্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে, ফলে বাস্তবে পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করা হচ্ছে না। এতে করে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সহকারী শেড ইনচার্জ ইউসুফ হোসেনের বদলি আদেশ থাকলেও তিনি এখনো বেনাপোলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেনের বদলির আদেশ থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে করে জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বন্দর পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, মিথ্যা ঘোষণার কিছু ঘটনা ঘটেছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে ঘোষণাকৃত পণ্যই সঠিক পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, আমি বদলি হয়েছি, কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কর্মকর্তা না থাকায় এখনো দায়িত্বে আছি।
তবে এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, যদি সত্যিই কঠোর নজরদারি থাকতো, তাহলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতো না। যারা ধরা পড়ছে, তারা তো কেবলমাত্র একটি অংশ বাকি কত পণ্য ধরা পড়ছে না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. মতিয়ার রহমান বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এখানে অনিয়ম চলতে থাকলে শুধু রাজস্ব ক্ষতিই নয়, পুরো বাণিজ্য ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হোক।
তিনি আরও বলেন, বন্দরের কার্যক্রম আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা, স্ক্যানিং ও মনিটরিং জোরদার করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।