
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে গত কয়েক দিন ধরে বিশ্ববাসীর নজর আটকে ছিল একটি টেবিলের দিকে। আশা করা হয়েছিল, কয়েক দশকের শত্রুতা ভুলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটি নতুন শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশায় গুড়ে বালি।
ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতা এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ঘোষণা করেছেন যে, ওয়াশিংটন তেহরানের আস্থা অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার পর ইসলামাবাদের রাজপথ থেকে শান্তি আলোচনার ব্যানার, ফেস্টুন সরিয়ে ফেলার দৃশ্যটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক প্রতীকী চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনা শেষে ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরান আলোচনার টেবিলে অত্যন্ত গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। আমরা আন্তরিকতা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ন্যূনতম আস্থা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে। গালিবাফের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তাদের একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
তিনি আরও যোগ করেন যে, আলোচনার পরিবেশটি ছিল অবিশ্বাস এবং সন্দেহে ঘেরা, যার মূল কারণ অতীতের চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁর অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, ওয়াশিংটন সরল বিশ্বাসে এই আলোচনায় অংশ নিয়েছিল এবং একটি সম্মানজনক সমাধানের চেষ্টা করেছিল।
ভ্যান্স সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা আমাদের সেরা এবং চূড়ান্ত প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম। কিন্তু তেহরান তা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, তারা আলোচনার জন্য সবটুকু চেষ্টা করেছে এবং এখন বল ইরানের কোর্টে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চূড়ান্ত প্রস্তাব দেওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন কূটনীতির পথকে সংকুচিত করে ফেলেছে।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ইসলামাবাদের চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। যে শহরটি গত কয়েক দিন কঠোর নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং যেখানে দুই দেশের পতাকাবাহী বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছিল, সেখানে এখন কেবল শূন্যতা। শ্রমিকদের দেখা গেছে বড় বড় বিলবোর্ড ও ব্যানারগুলো খুলে ফেলতে। এই দৃশ্যটি কেবল একটি সভার সমাপ্তি নয়, বরং একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ হারানোর সাক্ষ্য দিচ্ছে।
বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন তাঁর সামনে দুটি পথ খোলা আছে।
প্রথমত, সংঘাত বাড়ানো, যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয় তবে ট্রাম্প হয়তো ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ নীতি আরও কঠোর করবেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি যুদ্ধ বা সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, পুনরায় আলোচনা, হয়তো পর্দার আড়ালে নতুন কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আবারও যোগাযোগের চেষ্টা করা হবে। তবে গালিবাফের কঠোর অবস্থান এবং ভ্যান্সের শেষ প্রস্তাব সেই পথকে এখন অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে।
ইসলামাবাদে যখন কূটনীতি ব্যর্থ হচ্ছে, তখন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। আল জাজিরা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিন্ট জাবিল, সিদ্দিকিন এবং হানিয়া শহরে ইসরায়েলি বাহিনী একের পর এক অভিযান চালাচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, একদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ভেস্তে গেছে, অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নিজস্ব আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈরুতে অবস্থানরত আমাদের মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা জানাচ্ছেন যে, লেবাননের দক্ষিণে যুদ্ধের কোনো বিরাম নেই। সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়ছে এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলার হুমকিতে পুরো অঞ্চল এখন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।
তেহরান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আলোচনার ব্যর্থতা গভীর হতাশা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত।
মানুষ আশা করেছিল, একটি চুক্তি হলে হয়তো নিষেধাজ্ঞার বোঝা হালকা হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। কিন্তু স্পিকার গালিবাফের আস্থার অভাব সংক্রান্ত বক্তব্য সাধারণ মানুষের সেই স্বপ্নকে আবারও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। ইরান কি এখন তাদের পরমাণু কর্মসূচি আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে? উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক কি আরও নিবিড় হবে? অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াবে?
সবচেয়ে বড় ভয় হলো, এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পুরো এলাকা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্র যখন শর্ত দেয়, ইরান তখন গ্যারান্টি চায়।
আর এই চাওয়া, পাওয়ার মাঝখানে যে বিশাল শূন্যতা, তা পূরণ করতে কূটনীতি আপাতত ব্যর্থ হয়েছে। পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরান এখনই মাথা নত করতে রাজি নয়।
অন্যদিকে, জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কঠোর অবস্থানের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ইসলামাবাদের রাজপথের বিলবোর্ডগুলো হয়তো নেমে গেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের যে কালো মেঘ জমেছে, তা সরাতে আরও দীর্ঘ এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল, যা আপাতত দৃশ্যমান নয়।
বিশ্ববাসী এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। কূটনীতির পরাজয় কি তবে কামানের গর্জনকেই অনিবার্য করে তুলল? উত্তরটি হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। সূত্র: বিবিসি নিউজ
Leave a Reply