এম জালাল উদ্দীন, পাইকগাছা (খুলনা):: চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কুমোরপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের মাঝে এখন কর্মব্যস্ততার চরম সময় পার হচ্ছে। গ্রামীণ জনপদজুড়ে বসতে যাওয়া বারণীসহ বিভিন্ন মেলাকে ঘিরে তারা রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন মাটির নান্দনিক সব তৈজসপত্র ও শিশুদের খেলনা।
বাংলার চিরায়ত লোকউৎসব চড়ক মেলা ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে প্রতি বছরই গ্রামবাংলা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এর পরদিনই বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরি, শুকানো ও পোড়ানোর কাজ শেষ করে এখন চলছে রঙের ছোঁয়ায় সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলার ব্যস্ততা।
ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বিভিন্ন মেলায় মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়লেও বছরের অধিকাংশ সময়ই আর্থিক টানাপোড়েনে কাটে কুমোরদের জীবন। তবে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাকে ঘিরেই তারা কিছুটা আয়ের মুখ দেখেন। এই সময়টাতে তাদের তৈরি পণ্য গ্রামীণ মেলায় ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে এবং ছড়িয়ে দেয় ঐতিহ্যের আবহ।
পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া পালপাড়ায় প্রায় ১৫টি পরিবার এখনও মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি বাড়ির উঠানজুড়ে সাজানো মাটির তৈজসপত্র ও খেলনা। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করছেন। হাড়ি-পাতিল, কলসি, সানকি, মাটির ব্যাংক, ফুলের টবের পাশাপাশি শিশুদের জন্য পুতুল, হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, নৌকা, চুলা ও বিভিন্ন আকৃতির খেলনা তৈরি ও রঙ করার কাজে ব্যস্ত তারা।
মৃৎশিল্পী তারক পাল জানান, প্লাস্টিকের আধিপত্যে মাটির খেলনার চাহিদা আগের তুলনায় কমে গেলেও চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলাগুলোতে এখনও এসব পণ্যের কদর রয়েছে। “মেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় একশ’ খেলনা তৈরি করেছি। আশা করছি ভালো বিক্রি হবে,” বলেন তিনি।
মৃৎশিল্পী সাধনা রানী পাল বলেন, “চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করছি। এখন সেগুলো রঙ করার কাজ চলছে। আমি ও আমার স্বামী মিলে প্রায় পাঁচশ’ খেলনা তৈরি করেছি। প্রতিটি খেলনা ১০ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করবো।” তিনি জানান, প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির জিনিসের কদর কমলেও গ্রামীণ মেলাগুলোতেই এখনো এর চাহিদা টিকে আছে।
আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মৃৎশিল্পী রামপদ পাল বলেন, “আগের মতো মাটির জিনিসের বাজার না থাকলেও চৈত্র ও বৈশাখ এলেই চাহিদা বাড়ে। এ সময়টাতেই সারা বছরের কিছু আয় হয়।” তিনি আরও জানান, প্রায় তিনশ’ খেলনা তৈরি করেছেন, যা প্রতিটি ২৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রির আশা করছেন।
চৈত্র এলেই গ্রামবাংলার মানুষের মনে ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি, ধুলোমাখা পথ আর মেলার আনন্দঘন পরিবেশ। মেলা শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।