নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানতৃষ্ণা জাগিয়ে তোলা এবং বই পড়ার আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেগবান করার লক্ষ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
এই বৈঠকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়।
আলোচনাটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই টেবিলে অংশ নেন শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এছাড়াও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- কীভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের গণ্ডির বাইরে সৃজনশীল বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে ‘আলোকিত মানুষ’ গড়ার যে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন, সেটিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতে ক্লাসিক সাহিত্য ও বিশ্বজ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, সরকারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান অর্জন হলো সরকার এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
স্কুল-কলেজে গ্রন্থাগার কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় করা হবে।
ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি সম্প্রসারণ: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বা ‘বইয়ের গাড়ি’ প্রকল্পের পরিধি বাড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা: সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে, যা মেধা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল ও প্রিন্ট লাইব্রেরি সমন্বয়: বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমেও বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ শিক্ষা সংস্কারের ওপর জোর দেন। মাহদী আমিন এবং ডা. জাহেদ উর রহমান মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর করার পাশাপাশি বইয়ের স্পর্শে রাখা জরুরি। এটি তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতি ও মাদক থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল পথে ধাবিত করবে।
অধ্যাপক আবু সায়ীদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠাভ্যাসকে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী উভয়েই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, অধ্যাপক সায়ীদের দর্শন এবং সরকারি প্রশাসনের শক্তি এই দুইয়ের সমন্বয়ে দেশের প্রান্তিক এলাকা পর্যন্ত বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিশুদের শৈশব থেকেই বইমুখী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তাকে রাষ্ট্রীয় পূর্ণ সমর্থন দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আজকের এই বৈঠকটি সেই দাবিরই একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে যখন এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে এই মহৎ উদ্দেশ্যটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তার পাঠাগারের সংখ্যার ওপর। আজকের এই বৈঠকটি যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী দিনে বাংলাদেশ একটি রুচিশীল, মননশীল এবং প্রগতিশীল প্রজন্মের নেতৃত্ব পাবে এমনটাই প্রত্যাশা সুধী মহলের।
সচিবালয়ের এই আলোচনা শেষে দুই পক্ষই অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং প্রধানমন্ত্রীর এই মেলবন্ধন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে নতুন এক জোয়ার নিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। বইয়ের মাধ্যমে আলোক ছড়ানোর এই সরকারি মিশন যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, আজ সেটিই ছিল বৈঠকের মূল সুর।