গাজী তরিকুল ইসলাম, বটিয়াঘাটা থেকে:- গত মাসে যে একাডেমির ৭ জন খেলোয়াড় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছেন সেই একাডেমি এখন প্রচন্ড অর্থ সংকটে ভুগছে। খেলোয়াড়দের খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াত ভাড়া ও সরঞ্জামের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এই একাডেমির কার্যক্রম।
তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ৩৮টি নারী ফুটবল একাডেমির মধ্যে খুলনা জেলার একমাত্র নিবন্ধিত একাডেমি এটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি সুনামের সাথে পরিচালিত হচ্ছে। গত মাসের ২৯ এপ্রিল এই একাডেমির সোনিয়া আক্তার, ইভা বিশ্বাস, ঐশী মালাকার, বিথী খাতুন, সিমরান আক্তার, জ্যোতি মন্ডল ও বিপাশা আক্তার তিশা বাফুফের ট্রেনিং সেন্টার ধানমন্ডির মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ক্যাম্পে ডাক পেয়েছেন। এবছরের শুরুতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন এই একাডেমির ৩ জন খেলোয়াড়। এদের মধ্যে বাছাই পর্বে খুলনার সাবেক অধিনায়ক তানিশা আক্তার তন্নী টিকে আছেন। এছাড়া তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির অন্যতম সেরা খেলোয়াড় পুজা রায় ক্রীড়া পরিদপ্তরের অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় দলের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তিনি ঢাকার বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণরত আছেন। অচিরেই তাকে জাতীয় দলে দেখা যাবে। সব মিলে বর্তমানে এই একাডেমির ৯ জন খেলোয়াড় জাতীয় দলের ক্যাম্পে অনুশীলন করছেন। এতসব সাফল্যের পরেও এই একাডেমি বন্ধ হতে চলেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসের শেষে এই একাডেমির খেলোয়াড়দের উপর সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটে। চার নারী ফুটবলার মঙ্গলী বাগচি, সাদিয়া নাসরিন, হাজেরা খাতুন ও জুই মন্ডলকে লোহার রড দিয়ে মারধর ও হেনস্তা করার প্রতিবাদে সারা দেশ আক্রশে ফেটে পড়ে। তখন প্রশাসন ও এলাকাসীর সহযোগিতায় এই একাডেমি ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে এই একাডেমিতে অনেক নামিদামি নারী খেলোয়াড় আছে। তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক দেবাশীষ মন্ডল বলেন, '২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি তেতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেসব প্রাইমারির শিক্ষার্থীদের নিয়েই এই একাডেমি শুরু হয় তারা এখন সারা বাংলাদেশের নারীদের বিভিন্ন টুর্ণামেন্টে সুনামের সাথে ফুটবল খেলছেন। গত তিন বছর ধরে বটিয়াঘাটার নারী ফুটবলাররা অপ্রতিরোধ্য গতিতে জেলার শ্রেষ্ঠ দল হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বর্তমানে খুলনা বিভাগ এবং জেলা দলের অধিকাংশ নারী খেলোয়াড় এই একাডেমির। সম্প্রতি আর্থিক সংকটের কারণে আমরা নিয়মিত নতুন খেলোয়ারদের প্র্যাকটিস করাতে পারছিনা। প্রতিদিন প্র্যাকটিস চালাতে গেলে যে অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের নেই। এ বিষয়ে খুলনার ক্রিয়া অনুরাগীরা এগিয়ে না আসলে এই একাডেমির কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।'সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির কোচ সাবেক ফুটবলার মোস্তাকুজ্জামান বলেন, 'ফুঠবল খেলার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন। আমি শুধুমাত্র যাতায়াত ভাড়ার বিনিময়ে গত ৩ বছর ধরে এই একাডেমির মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এখানে প্রশিক্ষণরত মেয়েদের বুট, ফুটবলসহ পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। অর্থের অভাবে যারা দূর থেকে আসেন তারা নিয়মিত প্র্যাকটিসে আসতে পারেন না। এখানে অংশগ্রহণ করা অধিকাংশ মেয়েরা অতি দারিদ্র পরিবারের। প্র্যাকটিস করার পর ভালো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন না। বর্তমানে এই একাডেমিতে লিজা, জোনাকি, দেবীসহ আরও অনেক ভালো খেলোয়াড় আছেন। তারা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে অনেক দূর যেতে পারবেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অর্থ সংকটে ভুগছে। এই একাডেমি চালু রাখতে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে বন্ধ হয়ে যাবে। তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, শুরুতে একটি চক্র এই একাডেমি বন্ধ করতে নানাবিধ ষড়যন্ত্র করেছিল। আমরা তা প্রতিহত করেছি। এই একাডেমিতে আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলার মেয়েরা প্র্যাকটিসে আছেন। তাদের থাকা ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আমাদের করতে হয়, অনেকের যাতায়াত ভাড়া দিতে হয়। সবমিলে এই একাডেমি পরিচালনা করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমরা এ বিষয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। স্থানীয় এমপি মহোদয়ের সাথে আলোচনা করেছি। তিনি ভোটের আগে সুপার কুইনের বেশ কিছু ফুটবল ম্যাচ দেখতে মাঠে এসেছিলেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।