মনির হোসেন :: দেশের সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ও সমুদ্র বন্দরসমূহের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের সুবিশাল সমুদ্র, উপকূলীয় এবং তৎসংলগ্ন এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও সমুদ্র অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের সমুদ্র বন্দরসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সমুদ্র ও নৌপথে পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কোস্ট গার্ড দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সুরক্ষিত রেখে চলেছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহ একটি নিরাপদ ও সহায়ক বাণিজ্যিক পরিবেশ গড়ে ওঠার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগে আকর্ষণ এবং সুনীল অর্থনীতির বিকাশে কোস্ট গার্ড গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে সমুদ্র বন্দরগুলো আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আমাদের দেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র বন্দরসমূহের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করে দেশের সকল শিল্পখাত, জ্বালানি সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারব্যবস্থা। একটি নিরাপদ, সচল ও দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দেশের সকল সমুদ্র বন্দরসমূহের নিরাপত্তা রক্ষায় সার্বক্ষণিক নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। বিশেষত কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন কর্তৃক চট্টগ্রাম বন্দরের ও তৎসংলগ্ন এলাকায় চ্যানেল ও সমুদ্রপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি, নিয়মিত টহল কার্যক্রম এবং বহিঃনোঙরে বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের নিরবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিতের কারণে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর একটি নিরাপদ বন্দরে পরিণত হয়েছে।
বহিঃনোঙ্গরে ছিঁচকে চুরি, চোরাচালান দমন, বাণিজ্যিক জাহাজ হতে অবৈধভাবে মালামাল ক্রয় বিক্রয় বন্ধের জন্য আমরা উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করেছি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ড্রোন ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে এ সকল এলাকায় চোরাচালান ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযানে বহিঃনোঙরে গত দেড় বছরে নিয়মিত টহলের বাইরে ১,৩২০ এর অধিক অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ৪৭টি বাণিজ্যিক জাহাজে বোর্ডিং করে Piracy/Petty theft প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়াও, ৫টি জাহাজের চুরি যাওয়া মালামাল অতি দ্রুততার সাথে উদ্ধার করতঃ স্ব-স্ব জাহাজে ফেরত প্রদান করা হয়। কোস্ট গার্ডের এরুপ দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ বিগত সময়ে সর্বমোট ২৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে “Letter of Appreciation” প্রদান করেছে। এসকল কারণেই কোস্ট গার্ডের প্রতি স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের আস্থা পূর্বের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উক্ত কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে বিগত ২০২৫ সালে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ বছরে মোট ৪,২৭৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০.৫০ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৮.১৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা ১১.৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এ ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে বন্দরটি ৫,৪৬০ কোটি টাকা আয় করে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এর পাশাপাশি সুনীল অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশীল করার লক্ষ্যে সমুদ্র, উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে কোস্ট গার্ড। যার ফলশ্রুতিতে ReCAAP ও IMO রিপোর্ট অনুযায়ী নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের রেটিং উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বন্দরের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ReCAAP এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ও এর আশেপাশের সমুদ্র এলাকায় মোট ১৩টি Piracy/Petty theft ঘটনার তথ্য পাওয়া গেলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে ৪টিতে নেমে এসেছে। এছাড়াও, ২০২৬ সালে অদ্যাবধি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, যা কোস্ট গার্ডের নিরলস প্রচেষ্টা ও অভিযানিক তৎপরতার প্রতিফলন। পাশাপাশি, বন্দরের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যিক জাহাজের আগমন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়ে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম হারেও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্র বন্দরসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশের সুনীল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশ ও দেশের মানুষের সেবা ও সমৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যতেও এধরনের কার্যক্রমসমূহ অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।