ছবি: সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক:: ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের স্মৃতিবিজড়িত ময়দানে এক নতুন অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’। "আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ, এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আজ রোববার সকালে বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে তিনি পুলিশ বাহিনীকে দেশের সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সক্ষমতা এবং মানবিকতা নিয়ে কাজ করার কড়া নির্দেশনা প্রদান করেন।
উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রহরে এই রাজারবাগ থেকেই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল। পুলিশের রক্তে রঞ্জিত এই পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বাহিনীকে নতুন শপথে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অতীতে পুলিশ বাহিনীকে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই সংস্কৃতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। আমাদের পবিত্র দায়িত্ব হলো সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা, যার জন্য ১৯৭১ সালে পুলিশ ভাইয়েরা আত্মত্যাগ করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার জনগণের রায়ে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে গঠিত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষ এখন একটি ভীতিমুক্ত পরিবেশ এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে।
তারেক রহমান বলেন, "জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরই পুলিশের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে। আপনারা সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করবেন, এটাই আপনাদের কাছে রাষ্ট্রের প্রত্যাশা। তিনি আরও যোগ করেন, পুলিশকে কেবল একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু অমীমাংসিত দিক নিয়ে গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানে ও জাহাজে করে সৈন্য আনা হচ্ছিল, তখন কৌশলগত কারণে কেন বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে রাজারবাগে এক জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, একদিকে চট্টগ্রামে তৎকালীন মেজর জিয়ার ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা এবং অন্যদিকে রাজারবাগে পুলিশের মরণপণ প্রতিরোধ, এই দুই ঘটনাই মূলত মুক্তিকামী বাঙালিকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের সাহস জুগিয়েছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে সঠিক নেতৃত্ব ও সদিচ্ছা থাকলে পুলিশ বিভাগ যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ করে নারী পুলিশ সদস্যদের অবদান এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের সাহসিকতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন, বিদেশের মাটিতে অর্জিত এই সুনাম যেন দেশের মাটিতেও জনগণের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।
আজকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুশৃঙ্খল প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। প্যারেডে পুলিশ ও র্যাবের বিভিন্ন কন্টিনজেন্ট অংশ নেয়। কুচকাওয়াজ শেষে তিনি পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন এবং বাহিনীর আধুনিকায়নে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর সূচনা হলো, যা আগামী কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’-এর সার্বিক সাফল্য কামনা করেন এবং প্যারেডে অংশগ্রহণকারী সকল সদস্যকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি পুনরুল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং সেবাধর্মী, যেখানে 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।