নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এমপি-এর সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) এক গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতি-নির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এই সভা শুরু হয়।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, কাঠামোগত সংস্কার সাধন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মিশন নিয়ে আয়োজিত এই সভায় সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন।
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রেক্ষাপটে এবারের এনইসি সভাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা। সভায় মূলত দুটি প্রধান এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচিকে কেন্দ্র করে বিস্তারিত আলোচনা, মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদন এবং দ্বিতীয়টি হলো ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের নতুন পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলপত্র 'সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত রূপরেখাএর উপস্থাপনা ও অনুমোদন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি): লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার
সভার প্রথম ভাগে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর খসড়া রূপরেখা পেশ করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় এবারের এডিপিতে জনকল্যাণমুখী, অপচয়রোধী এবং সুষম উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
এবারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: দেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের টেকসই রূপান্তর: দেশের শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান আবাসিক চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলোকে এডিপিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ অবকাঠামো: চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত সমাপ্তির পাশাপাশি গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে গতিশীলতা আসে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্নত বীজ উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকার যেন সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার হয় এবং কোনো প্রকল্পই যেন নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে গিয়ে সরকারের বাড়তি ব্যয়ের কারণ না হয়, সে বিষয়ে তিনি মন্ত্রণালয়গুলোকে কঠোর মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেন।
সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত রূপরেখা ২০২৬/২০৩০
সভার দ্বিতীয় এবং অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত উন্নয়নের দিকনির্দেশনা সম্বলিত কৌশলপত্র এর রূপরেখা উপস্থাপন।
পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে এই কৌশলপত্রের মূল প্রবন্ধ ও স্লাইড প্রেজেন্টেশন প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। এই কৌশলপত্রটি মূলত প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে দেশের সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
কৌশলগত রূপরেখার প্রধান স্তম্ভসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসন সংস্কার
বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই রূপরেখায় দেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এই কাঠামোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
খ. সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার অবমূল্যায়ন রোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক নীতি এবং মুদ্রানীতি ,এর সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গ. কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যুব উন্নয়ন
আগামী পাঁচ বছরে দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে।
ঘ. বেসরকারি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজীকরণ সূচকের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটানো হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং এক দরজায় সেবা কে কার্যকর করার মাধ্যমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঙ. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ
দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা ভাতাগুলোর পরিমাণ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে স্থায়ী তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে এই কৌশলপত্রে।
এনইসি সভায় কৌশলপত্রটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। অনুমোদন প্রদানকালে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে এক দূরদর্শী বক্তব্য প্রদান করেন।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যেন দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। সুশাসন এবং সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। 'FYSF 2026-2030' কেবল একটি খসড়া দলিল নয়, এটি আগামী পাঁচ বছরে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ।
প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নের প্রতি নজর রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের কোনো অঞ্চল যেন উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত না হয়। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চল- সব জায়গার মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রতিফলন এই উন্নয়ন বাজেটে থাকতে হবে।
একই সাথে তিনি আমলাতন্ত্রকে আরও গতিশীল ও জনবান্ধব হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করারও তাগিদ দেন তিনি।
আজকের এই এনইসি সভার মাধ্যমে অনুমোদিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত রূপরেখা (FYSF) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গৃহীত এই নীতি ও সংস্কার কর্মসূচিগুলো যদি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতিকে যেকোনো বৈশ্বিক মন্দা থেকে রক্ষা করতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদেরা।
দুপুর ২:৩০ মিনিটে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রী সংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সভার বিস্তারিত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদিত বাজেটের আকার গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।