নিজস্ব প্রতিবেদক:: দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) পরিদর্শন ও টেস্ট ড্রাইভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি দেশের পরিবেশবান্ধব এই উদীয়মান শিল্প খাতের বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নীতিগত সহায়তা ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
শনিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক গাড়ি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিদর্শন শেষে তিনি নিজেই একটি স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) এবং একটি কাভার্ড ভ্যান চালিয়ে টেস্ট ড্রাইভ করেন। দেশীয় মেধা ও প্রযুক্তিতে তৈরি এসব পরিবেশবান্ধব যানবাহনের কার্যক্ষমতা দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান (হাসান শিবলু) সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আজ সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্যালয়ে পৌঁছালে পিএমও প্রাঙ্গণে প্রদর্শনের জন্য রাখা বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলো ঘুরে দেখেন। এরপর তিনি নিজ চেম্বারে প্রবেশের আগে গাড়িগুলোর কারিগরি দিক ও স্থায়িত্ব যাচাই করতে নিজেই চালকের আসনে বসেন।
পরিদর্শন ও টেস্ট ড্রাইভ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার কার্যালয়ে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে কোম্পানির চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসাইন খান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজারের সম্ভাবনা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে এই গাড়ি রপ্তানির রোডম্যাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে গাড়ি উৎপাদন করা গেলে এবং এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে অবদান রাখলে সরকার এই শিল্পের প্রসারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানি ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে।
উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দেশের প্রথম সম্পূর্ণ ইভি (বৈদ্যুতিক যানবাহন) প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। এই গাড়িগুলো শতভাগ ব্যাটারি চালিত এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এতে কোনো ধরনের জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় না, যা দেশের আমদানিকৃত জ্বালানি খাতের ওপর চাপ অনেকাংশে কমাবে। পাশাপাশি প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ না বাড়িয়ে কম বিদ্যুৎ খরচে এসব গাড়ি চার্জ করা সম্ভব। সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করেই এসব গাড়ির মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসাইন খান গণমাধ্যমকে বলেন, যদিও এসব গাড়ি দেশীয় মেধা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে, তবে কিছু অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যদি সরকার আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর রেয়াত সুবিধা প্রদান করে, তবে অত্যন্ত কম মূল্যে এসব আন্তর্জাতিক মানের গাড়ি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির গাড়ির মান সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রকাশ করে বলেন, তাদের উৎপাদিত প্রতিটি যানবাহন ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। তারা আশাবাদী যে, অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করে শিগগিরই এই বৈদ্যুতিক গাড়ি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে, যা দেশের রপ্তানি আয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আজ সকালে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের জন্য কার্যালয় প্রাঙ্গণে মোট সাতটি দেশীয় বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ছিল দুটি আধুনিক স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি), একটি কাভার্ড ভ্যান, একটি ট্রাক, একটি থ্রি-হুইলার অটো-রিকশা এবং দুটি মোটরসাইকেল।
প্রধানমন্ত্রী গাড়িগুলো পরিদর্শনের সময় কোম্পানির প্রকৌশলী ও প্রতিনিধিদল তাদের কারিগরি ও যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি একটি এসইউভিতে ওঠেন এবং সেটি নিজেই চালিয়ে প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন। পরে তিনি কাভার্ড ভ্যানটিরও টেস্ট ড্রাইভ সম্পন্ন করেন।
কোম্পানির কারিগরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাদের তৈরি প্রতিটি এসইউভি একবার পূর্ণ চার্জে ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে সক্ষম। সাধারণ চার্জিং সিস্টেমে ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা, তবে ফাস্ট চার্জিং সুবিধায় মাত্র ৩০ মিনিটে গাড়ি সম্পূর্ণ চার্জ করা যায়।
অন্যদিকে, পণ্য পরিবহনের জন্য তৈরি কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকগুলোও সমমানের কার্যক্ষমতা সম্পন্ন। এগুলো একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ২০০ কিলোমিটার চলতে পারে। সাধারণ চার্জিংয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা এবং ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তিতে মাত্র ৪০ মিনিটে সম্পূর্ণ চার্জ করা সম্ভব। এসব যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রচলিত জ্বালানি চালিত গাড়ির তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরে বায়ু ও শব্দ দূষণ কমাতে এই ইভি প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রচলিত জ্বালানি চালিত যানবাহন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হলেও ব্যাটারি চালিত এসব গাড়ি শূন্য-কার্বন নির্গমন নিশ্চিত করে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশীয় বাজারে ডলার সংকটের সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগ সফল হলে হালকা প্রকৌশল শিল্প এবং ব্যাটারি প্রযুক্তি নির্ভর একটি শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠবে, যা হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
এই পরিদর্শন, টেস্ট ড্রাইভ ও উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মোঃ শাকিরুল ইসলাম খানসহ পিএমও’র অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর এই প্রত্যক্ষ পরিদর্শন ও টেস্ট ড্রাইভের মাধ্যমে দেশের অটোমোবাইল শিল্পে নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকার যদি এই খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করে নীতিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে খুব দ্রুতই “মেড ইন বাংলাদেশ” ব্র্যান্ডের গাড়ি দেশের রাস্তায় চলবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি পাবে।