ঘোড়াঘাট দিনাজপুর প্রতিনিধি:: দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনেক সময় সংকট ও স্থবিরতার খবর এলেও, কিছু ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ পরিবর্তনের আশার আলো দেখায়। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মোঃ আব্দুল—আল—মামুন কাওসার শেখ তেমনই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে যখন দেশের বিভিন্ন পৌরসভায় নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তখন তিনি ঘোড়াঘাট পৌরসভায় এক ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
সততা ও কর্মদক্ষতায় অনন্য মামুন কাওসার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা সরকারি সেবক হিসেবে নিজের দক্ষতা ও সততার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঘোড়াঘাটে যোগদানের পর থেকেই কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরে তিনি এনেছেন আমূল পরিবর্তন।
পৌর প্রশাসনে দৃশ্যমান উন্নয়ন ও সুশাসন
পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নাগরিক সেবায় যোগ হয়েছে নতুন গতি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন:
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: পৌর এলাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩.৮৩৮ কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণ করা হয়েছে (চলমান), যার প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। ওসমানপুর ও বাগেরহাট বাজারের অলিগলি সংস্কার, আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণ এবং স্ট্রিট লাইট স্থাপনের মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন তিনি। এছাড়া বাস স্ট্যান্ডে তৈরি করেছেন যাত্রী ছাউনি।
আর্থিক শৃঙ্খলা ও বকেয়া বেতন পরিশোধ: দায়িত্ব পাওয়ার ২২ মাসে তিনি কর্মকর্তা—কর্মচারীদের বিগত ৩৪ মাসের বকেয়া বেতন—ভাতা পরিশোধ করেছেন। তাঁর যোগদানের আগে ১৯ মাসের বেতন বকেয়া থাকলেও, বর্তমানে তা মাত্র ৭ মাসে নামিয়ে এনেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এমন কর্মনিষ্ঠা আগে কখনোই দেখা যায়নি।
রেকর্ড বাজেট: গত ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে তিনি ঘোড়াঘাট পৌরসভার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৫৫ কোটি ৯৪ লাখ ২ শত টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন।
সহজতর নাগরিক সেবা: জন্ম ও নাগরিকত্ব সনদসহ সব ধরণের প্রত্যায়নপত্র ও ওয়ারিশান সনদ এখন থেকে মাত্র ১ দিনেই প্রদান করা হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগ অনেকাংশেই লাঘব করেছে।
ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা: দালালমুক্ত ভূমি অফিস
একজন দক্ষ এসিল্যান্ড হিসেবে তিনি ঘোড়াঘাট ভূমি অফিসকে দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। অতীতে যেখানে নামজারি (খারিজ) সেবা নিতে সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানি ও ঘুষের শিকার হতে হতো, সেখানে এখন মাত্র ১১৭০ টাকা সরকারি ফি দিয়ে স্বচ্ছতার সাথে মানুষ সেবা পাচ্ছে। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা শত শত জটিল ভূমি মামলা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।
মাঠ প্রশাসনে সক্রিয়তা
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তিনি। এছাড়া অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে রাস্তা প্রশস্ত করার মাধ্যমে যানজট নিরসনেও সফল ভূমিকা পালন করছেন।
জনমনে আস্থার প্রতীক
৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা গোলাম রব্বানী বলেন, "আমাদের এলাকার রাস্তাগুলো যুগের পর যুগ কাঁচা ছিল। এসিল্যান্ড স্যারের মতো একজন সৎ মানুষ দায়িত্ব পালন করায় আজ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।"
সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার পারভেজ বলেন, "বেতন বকেয়া থাকায় কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। নতুন প্রশাসকের বদৌলতে আজ আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি।"
এই সাফল্যের বিষয়ে মোঃ আব্দুল—আল—মামুন কাওসার শেখ বলেন, "আমি সরকারের একজন সেবক হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করছি। সাধারণ মানুষ যেন কোনো হয়রানি ছাড়া তাদের প্রাপ্য সেবা পায়, সেটিই আমার মূল লক্ষ্য।"
প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু ও অনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে ৩৮তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার সাহসী উদ্যোগ আজ ঘোড়াঘাটের সাধারণ মানুষের মনে এক আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, আব্দুল—আল—মামুন কাওসার শেখের মতো কর্মনিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিটি উপজেলায় থাকলে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী ও জনবান্ধব হবে।