
বিশেষ প্রতিনিধি:: বাংলাদেশে আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যখন জন আলোচনার কেন্দ্রে, ঠিক তখনই ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) শব্দের ব্যবহার নিয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ‘মব’ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সতর্কতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন, তাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ‘হুমকি’ বা ‘থ্রেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
রোববার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এই উত্তপ্ত বিতর্ক তৈরি হয়। সংলাপে উপস্থিত বিশিষ্টজনরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আইনের শাসনের পরিবর্তে যদি ‘মবোক্রেসি’ বা মব-তন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সংকট তৈরি করবে।
সংলাপের শুরুতেই সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করীম আব্বাসি বর্তমান বিচারিক পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিচার বিভাগের চেয়ে ‘মবোক্রেসি’ বা মব-এর শাসন বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল’ এবং রাস্তায় ‘তৌহিদি জনতা’র নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
আব্বাসি স্পষ্ট করে বলেন, পরিস্থিতি যদি এমন থাকে যে তথাকথিত জনতা আইন নিজের হাতে নিতে পারে এবং দোষীদের শাস্তি দিতে গড়িমসি চলে, তবে আইনের শাসন নিশ্চিত করার প্রতীকী চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হতে বাধ্য।
একই সুরে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যেকোনো অবিচারকে প্রশ্রয় দিলে তার ফল হিতে বিপরীত হয়। তিনি বলেন, মবকে অ্যালাউ করা হয়েছিল, এখন সেই মব সরকারকে খেয়ে ফেলছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনকেও তারা গ্রাস করতে চাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশকেও খেয়ে ফেলতে পারে।
আলোচনার এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ‘মব’ শব্দটির ব্যবহার নিয়ে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি মনে করেন, জুলাই-আগস্টের বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যই বারবার ‘মব’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, গণভবনের পতনের যে বিশাল গণআন্দোলন, তার সাথে যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন ছিনতাই বা কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে মেলানো হয়, তবে তা হবে অনভিপ্রেত। এই দুটো বিষয়কে এক পাল্লায় মাপা যাবে না।
তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে বলেন, বিপ্লবের অর্জনকে খাটো করতে যারা বারবার ‘মব’ শব্দটি ব্যবহার করছেন, তাদের সংযত হওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই শব্দটি প্রয়োগের আগে অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে যাতে বিপ্লবীদের অপমান করা না হয়।
তাজুল ইসলামের এই বক্তব্য শোনার পর সংলাপে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স তাজুল ইসলামের বক্তব্যকে একটি ‘থ্রেট’ বা হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, একদিকে আপনারা আইনের শাসন চাইবেন, আবার অন্যদিকে মবকে উসকে দেবেন—এটা বাংলাদেশে চলতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
একই সুরে কথা বলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি তাজুল ইসলামের বক্তব্যকে অগণতান্ত্রিক এবং বিচারিক সংস্কৃতির জন্য নেতিবাচক হিসেবে আখ্যা দেন। বিএনপি নেত্রী নিলুফার চৌধুরীও এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
আলোচনায় উঠে আসে যে, বিচারপ্রক্রিয়াকে যদি রাস্তার মানুষের আবেগের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে প্রকৃত ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক নেতাদের মতে, আইনের রক্ষক হয়ে ‘মব’ বা গণ-আদালতকে জাস্টিফাই করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত।
সংলাপের সঞ্চালক ও সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এই বিতর্কে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগেও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘মব’ বলে কিছু নেই বরং তারা ‘প্রেশার গ্রুপ’—এমন সাফাই গাওয়া হয়েছিল।
জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা দেখেছি যখনই মবের পক্ষে এ ধরনের জাস্টিফিকেশন দাঁড় করানো হয়, তার পরপরই বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। ইতিপূর্বে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের ওপর আঘাত আসার প্রেক্ষাপটও এভাবেই তৈরি করা হয়েছিল। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আবারও যখন মবের পক্ষে কথা বলা শুরু হয়েছে, তখন সামনে হয়তো আরও বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের দেখতে হতে পারে।
সংলাপের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত হওয়াই নয়, বরং মব-প্রেশার বা জন-উন্মাদনা থেকেও মুক্ত থাকা জরুরি। আলোচকদের বড় অংশই একমত হন যে, বিপ্লব ও অপরাধকে আলাদা করতে হবে। বিপ্লবের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি আইন হাতে তুলে নেয়, তবে তাকে অপরাধী হিসেবেই বিচার করতে হবে।
আজকের সংলাপটি এটিই স্পষ্ট করে দিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথটি যে এখনও বেশ কণ্টকাকীর্ণ, ‘মব’ বিতর্ক তারই একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।
Leave a Reply