
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেন, তখন বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছিল যে চীনের অর্থনীতি হয়তো মার্কিন শুল্কের চাপে ভেঙে পড়বে। কিন্তু এক বছর পর চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্ক নীতি এবং অস্থির কূটনৈতিক আচরণের বিপরীতে চীন এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন মেরু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে, যা বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক দাপুটে ঘোষণা।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পূর্বানুমান করা অসম্ভব’ এমন সিদ্ধান্তের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোও এখন বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চীন সফর এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। দীর্ঘ আট বছর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নির্দেশ করে যে, লন্ডনের কাছে এখন বেইজিংয়ের সাথে বাণিজ্যিক উষ্ণতা বজায় রাখা ওয়াশিংটনের অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই চিত্র দেখা গেছে কানাডার ক্ষেত্রেও। দীর্ঘ সাত বছর পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেইজিং সফর করেছেন এবং চীনকে ‘অনুমানযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের অনিশ্চিত বাণিজ্য নীতির ফলে কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এখন নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য বিকল্প বাজারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
মার্কিন পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি সত্ত্বেও চীন তার রপ্তানি বাজার বহুমুখী করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে তা বেড়েছে অভাবনীয় হারে।
আফ্রিকায় রপ্তানি বৃদ্ধি: ২৫.৮%
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (ASEAN) বৃদ্ধি: ১৩.৪%
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বৃদ্ধি: ৮.৪%
লাতিন আমেরিকায় বৃদ্ধি: ৭.৪%
এই বহুমুখী রপ্তানি কৌশলের ফলে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডিসেম্বরেই দেশটি একক মাসে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে ইতিহাস গড়েছে।
ট্রাম্পের অস্থিতিশীল নীতি ডলারের আন্তর্জাতিক আবেদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনের মুদ্রা ইউয়ান (রেনমিনবি) ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বর্তমানে চীনের আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হচ্ছে ইউয়ানে, যা মাত্র পাঁচ বছর আগেও নগণ্য ছিল। বড় বড় বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো এখন ইউয়ানের তারল্য বাড়াতে এবং দ্রুত লেনদেনের অবকাঠামো তৈরিতে মনোনিবেশ করছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি পরোক্ষভাবে ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতির চাপে কেবল চীনের মিত্ররাই নয়, বরং ভারতের মতো দেশগুলোও কৌশলগত পরিবর্তন আনছে। গত মঙ্গলবার ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। ২০৩২ সালের মধ্যে ইউরোপ থেকে ভারতে রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তি করা হয়েছে। এটি পরিষ্কার বার্তা দেয় যে, বিশ্বশক্তিগুলো এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে নেই।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে চীন সম্প্রতি বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো শহরগুলোতে টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করেছে। শেয়ারবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত এক বছরে সাংহাই সূচক ২৭ শতাংশ বেড়ে মার্কিন শেয়ারবাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। বোস্টন কলেজের অধ্যাপক আলেকজান্ডার টমিকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যত কঠিন হয়ে উঠছে, চীনের জন্য ততই বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চীনের এই ‘নতুন বন্ধুসুলভ’ কৌশলে সবাই যে পুরোপুরি আশ্বস্ত, তা কিন্তু নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া কিম মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা মানেই চীনের ওপর অন্ধ বিশ্বাস নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার, মানবাধিকার ইস্যু এবং বিভিন্ন দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পুরনো রেকর্ড এখনো বেইজিংয়ের ওপর সন্দেহের মেঘ জিইয়ে রেখেছে। কিমের মতে, ট্রাম্পের তুলনায় চীনকে আপাতত সংযত মনে হলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এখনো বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, কেবল ভয় দেখিয়ে বা শক্তি প্রয়োগ করে বিশ্ব নেতৃত্ব বজায় রাখা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, চীন তখন ‘বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের’ কার্ড খেলে বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হচ্ছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাক্ষী হচ্ছে, যেখানে ডলারের একাধিপত্য হুমকির মুখে এবং বেইজিং এখন আর কেবল প্রতিযোগী নয়, বরং অনেকের কাছেই একমাত্র ‘স্থিতিশীল’ বিকল্প।
Leave a Reply