
এম জালাল উদ্দীন:পাইকগাছা:: এক সময় গ্রামবাংলার যাতায়াত ব্যবস্থা ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পালকি। বিয়ে, উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান এমনকি অসুস্থ রোগী পরিবহনেও পালকির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। কাঁধে ভর করে পালকি বাহকেরা গানের তালে তালে বহন করতেন কাঠের তৈরি এই বাহন, যা গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গৌরবময় স্মৃতির প্রতীক হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।
গ্রামীণ কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কাঠ, বাঁশ ও কাপড়ের সমন্বয়ে তৈরি হতো পালকি। রঙিন নকশা, পর্দা ও কারুকাজে সজ্জিত পালকির সৌন্দর্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিশেষ করে নববধূকে পালকিতে করে শ্বশুরবাড়িতে নেওয়ার দৃশ্য ছিল গ্রামবাংলার এক আবেগঘন ও স্মরণীয় ঐতিহ্য। সেই দৃশ্য আজ কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ।
গত দুই দশক আগেও খুলনার পাইকগাছা উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় পালকির ব্যবহার দেখা যেত। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী বাহনটি প্রায় বিলুপ্ত। নতুন প্রজন্ম পালকির নাম শুনলেও বাস্তবে নববধূকে পালকিতে করে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার দৃশ্য তারা দেখেনি।
আধুনিক যানবাহনের সহজলভ্যতা, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নগরায়নের প্রভাবে পালকির ব্যবহার ক্রমশ কমে এসেছে। এখন কেবল ঐতিহ্যবাহী মেলা, লোকজ উৎসব কিংবা সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতেই পালকির দেখা মেলে। ফলে পালকি বহনকারী বহু শ্রমজীবী মানুষ পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
উপজেলার রাড়ুলী ইউনিয়নের কাটিপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের ঋষিপাড়ার কয়েকজন প্রবীণ পালকি বাহক জানান, পালকি শুধু একটি বাহন ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের প্রতীক। তাদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে হলে গ্রামীণ সংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সংস্কৃতিপ্রেমীদের অভিমত, পালকিকে লোকজ ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করে পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একদিকে যেমন ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
সবশেষে স্মরণ আসে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই অমর পঙ্ক্তি—
“পালকি চলে! পালকি চলে!
গগন তলে আগুন জ্বলে!…
আর দেরি কত?
আরও কত দূর?”
Leave a Reply