
ডেস্ক:: গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দল বিএনপির নেতৃত্বে আজ গঠিত হয়েছে নতুন সরকার।
মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পরপরই শপথ নিয়েছেন ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথ বাক্য পাঠ করান। এবারের মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই প্রশাসনে যেমন বিএনপির নিজস্ব শক্তি রয়েছে, তেমনি রাজপথের মিত্র শক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মেধাবী তরুণদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে জুনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর ও ববি হাজ্জাজের মতো নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।
নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টনে মেধা ও অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয় দেখা গেছে। রাজপথের জনপ্রিয় নেতা এবং গণঅধিকার পরিষদের সদস্য নুরুল হক নুরকে দেওয়া হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
তাঁকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়, অর্থ, পরিকল্পনা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠনে তাঁর এই দায়িত্ব পালন এখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ ববি হাজ্জাজকে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বৈদেশিক সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন দিনের বার্তা নিয়ে যেতে শামা ওবায়েদ ইসলামকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের মেধাবী আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় জরাজীর্ণ ভূমি সেবাকে ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত করার ম্যান্ডেট পেয়েছেন তিনি।
এছাড়া শেখ ফরিদুল ইসলামকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পরিবেশ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মো. আব্দুল বারীকে দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সাবেক গোলরক্ষক মো. আমিনুল হককে তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞ কোটায়।
যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে হাবিবুর রশিদকে সড়ক পরিবহন এবং মো. রাজিব আহসানকে রেলপথ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ঢাকার রাজপথের লড়াকু নেতা ইশরাক হোসেনকে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এম এ মুহিতকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফারজানা শারমীন দায়িত্ব পেয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। মো. শরিফুল আলমকে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলের এই শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
শপথ শেষে নতুন প্রতিমন্ত্রীরা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তাঁদের প্রধান কাজ হবে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার মাধ্যমে অর্জিত এই গণতন্ত্রকে সুসংহত করা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, এই ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর তারুণ্যদীপ্ত উদ্যমই হবে আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার মূল চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল।
আজ রাত থেকেই নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তাঁদের নিজ নিজ দপ্তরে কাজ শুরু করবেন। ১৮ মাসের প্রতীক্ষার পর সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে, এই নতুন রক্তবাহী মন্ত্রিসভা দেশজুড়ে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
Leave a Reply