
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে নাটকীয়ভাবে আটকের পর বিশ্ব রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। গত শনিবার মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের হাতে মাদুরো বন্দী হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দুই ভাগে বিভক্ত।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার পর এবার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মুখ খুলেছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো দেশ নিজেকে ‘বিশ্বের পুলিশ’ বা ‘বিশ্বের বিচারক’ হিসেবে দাবি করতে পারে না।
চীনের কড়া হুঁশিয়ারি: সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
সোমবার বেইজিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে ওয়াং ই ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমরা কখনোই বিশ্বাস করি না যে কোনো রাষ্ট্র বিশ্বের পুলিশ হিসেবে কাজ করতে পারে, আর কোনো দেশ নিজেকে আন্তর্জাতিক বিচারক হিসেবে দাবি করবে—তাও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
মাদুরোকে হাতকড়া পরা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিউইয়র্কের ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়ার ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর এটিই ছিল বেইজিংয়ের প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া। চীন মনে করে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা উচিত। এই সামরিক হস্তক্ষেপকে চীন ‘একপাক্ষিক দাদাগিরি’ (Unilateral Bullying) হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
কেন ভেনেজুয়েলা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভেনেজুয়েলা চীনের ‘অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’। ২০১৭ সাল থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির জীবনীশক্তি হয়ে ছিল। ২০২৪ সালে চীন ভেনেজুয়েলা থেকে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনেছে, যার বড় অংশই ছিল অপরিশোধিত তেল।
এছাড়া ভেনেজুয়েলার তেল খাতে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। মাদুরোর পতন এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে চীনের এই বিশাল বিনিয়োগ ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা: ভেনেজুয়েলার তেল ও শাসনভার
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো লুকোছাপা করেননি।
মার-এ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া তেল শিল্পকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পুনর্গঠন করা।
ট্রাম্পের মতে, “যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে এবং এই ব্যবস্থা পুনরায় গড়ে তুলবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই অভিযানের যাবতীয় খরচ ভেনেজুয়েলার তেলের সম্পদ থেকেই ‘উসুল’ করা হবে।
কারাকাসে অস্থিরতা: ডেলসি রদ্রিগেজের শপথ ও গোলাগুলি
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে পরিস্থিতি এখনো থমথমে। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর সোমবার ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
তবে শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা পরেই রাজধানী কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদের সামনে ভারী গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রাসাদের ওপর দিয়ে অজ্ঞাত ড্রোন উড়তে দেখা গেলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। হোয়াইট হাউস অবশ্য এই গোলাগুলির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে।
এদিকে নিউইয়র্কের আদালতে প্রথম হাজিরাতেই মাদুরো নিজেকে ‘যুদ্ধবন্দী’ (Prisoner of War) হিসেবে দাবি করেছেন এবং ড্রাগ পাচারের সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর প্রভাব
এই ঘটনার প্রভাব কেবল লাতিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সফলভাবে ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তবে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যদি জাতিসংঘে এই সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে বিশ্ব এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে।
নিকোলাস মাদুরোর আটক এবং ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির নতুন প্রয়োগ বিশ্বব্যবস্থাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চীনের তীব্র প্রতিবাদ এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply