
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:: বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান আজ এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন উপস্থিতিতে দেশবাসীর নজর কেড়েছেন।
রোববার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি তার জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক নীতিনির্ধারণী বক্তব্য পেশ করেন।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি তার দাদি এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষা ও নারী উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উদাহরণ টেনে আনেন, যা উপস্থিত সুধীজনদের চমৎকৃত করে।
জাইমা রহমান লন্ডনে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দিনগুলোর একটি স্মৃতিচারণ করে বলেন, গত বছরের শুরুর দিকে দাদু যখন লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন একদিন একজন নাইজেরিয়ান নার্স তাকে দেখে চিনতে পারেন। আমার বাবা তারেক রহমান ও মা অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি দাদুকে কীভাবে চেনেন? সেই নার্স তখন উত্তর দিয়েছিলেন, আপনার মা তো বাংলাদেশের সেই প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, যার প্রবর্তিত নারী শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার মডেল অনুসরণ করে আজ আমাদের দেশের নাইজেরিয়া গ্রামাঞ্চলে লাখ লাখ মেয়ে শিক্ষা পাচ্ছে। নাইজেরিয়া সরকার ৩৫ থেকে ৩০ বছর আগেই বেগম জিয়ার সেই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করেছিল।
জাইমা আরও যোগ করেন, এ ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মাটি থেকে শুরু হওয়া একটি কার্যকর নীতি কীভাবে হাজার মাইল দূরে অন্য একটি মহাদেশের মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
নারীদের কেবল গৃহিণী হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান জাইমা রহমান।
তিনি বলেন, জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে ঘরের এক কোণে বসিয়ে রেখে বাংলাদেশ কোনোদিন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে না। লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে পারলে নারীরা জিডিপিতে যে বিশাল অবদান রাখতে পারে, তার উদাহরণ উন্নত বিশ্বেই রয়েছে।
তিনি নিজের মা ডা. জুবাইদা রহমানের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমার মা একজন সফল কার্ডিওলজিস্ট এবং একই সাথে একজন নিপুণ গৃহিণী। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক সুযোগ ও দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে একজন নারী কর্মক্ষেত্র এবং পরিবার, দুটি জায়গাই সমান দক্ষতায় পরিচালনা করতে পারেন।
প্রথমবারের মতো নীতিনির্ধারণী সংলাপে অংশ নিয়ে জাইমা রহমান তার পরিপক্ক রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় দেন। তিনি বলেন, আজ আমরা এখানে যারা বসেছি, আমাদের সবার আদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। কিন্তু আমরা একে অপরের কথা শুনছি, আলোচনা করছি, এটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। আমি এখানে কোনো বিশেষজ্ঞ হিসেবে আসিনি, এসেছি শিখতে এবং শুনতে। দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার ভেতরে থাকা উচিত।
অনুষ্ঠানে কেবল জাইমা রহমানই নন, দেশের বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্বরাও তাদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিয়ে বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো একসেস টু ফাইন্যান্স। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা এখনো চরম বৈষম্যের শিকার। আগামীতে যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তাদের এ বিষয়টিতে বিশেষ নজর দিতে হবে।
সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তামারা আবেদ বলেন, নারীদের শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, তাদের হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিলে তারা দেশের উন্নয়নে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের এ বক্তব্যকে অনেকে তার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের একটি সংকেত হিসেবে দেখছেন। যদিও তিনি বিনয়ের সাথে নিজেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন, কিন্তু তার বক্তব্যে আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ফুটে উঠেছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক ও নারী শিক্ষায় সংস্কার তথা বেগম জিয়ার মডেলকে যুগোপযোগী করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন তথা জিডিপিতে নারীদের অদৃশ্য অবদানকে দৃশ্যমান করা এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতা তথা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা। ঢাকা ফোরামের এ আলোচনা সভা কেবল একটি সংলাপে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং এটি হয়ে উঠেছে তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার এক মিলনমেলা।
জাইমা রহমানের সাবলীল বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সফলতাকে তুলে ধরার বিষয়টি দেশের তরুণ প্রজন্মের নারীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a Reply