
সংগৃহীত ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে বাংলাদেশ কেবল রাজপথে উত্তাল ছিল না, বরং সমান্তরাল এক যুদ্ধ চলছিল ডিজিটাল মহাকাশে। সেই সময়কার ‘মহাসক্তিশালী’ সরকারের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত—ইন্টারনেট শাটডাউন বা সম্পূর্ণ অনলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ।
বুধবার সকালে রাজধানীর ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে পুনরায় উঠে এল সেই ঐতিহাসিক সত্য। ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন, কীভাবে আধুনিক যুগে তথ্যপ্রবাহ রোধ করার হঠকারী সিদ্ধান্ত একটি সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় ড. ইউনূস বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন তা জনরোষকে শান্ত করার বদলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিল। তথ্য পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে মানুষের মনে যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি মহাশক্তিশালী সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি বিশ্লেষণ করেন যে, বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি অংশ। জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে যখন ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, তখন বিদেশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এক চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছায়। ড. ইউনূসের মতে, প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের টুঁটি চেপে ধরে কোনো শক্তিই টিকে থাকতে পারে না।
‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ মূলত দেশের উদ্ভাবক ও তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। অনুষ্ঠানের কেন্দ্রে থাকা তরুণদের উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “নতুন বাংলাদেশের মূল কারিগর তোমরা। জুলাই বিপ্লবে তোমরা যেমন রাজপথে সাহসের পরিচয় দিয়েছ, তেমনি উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বজয়ে তোমাদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি কেবল দেশীয় প্রেক্ষাপটে নয়, বরং বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও শ্রমকে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের হতে হবে ‘উদ্যোক্তা’ ও ‘উদ্ভাবক’।
প্রযুক্তি খাতের প্রচলিত ধারা নিয়ে ড. ইউনূস কিছু কঠোর কিন্তু সত্য মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেছি অনেক বছর, কিন্তু আমাদের মানসিকতা রয়ে গেছে সেই মান্ধাতা আমলের। প্রযুক্তি খাতে এখনও সনাতন বা গতানুগতিক চিন্তাভাবনা গেঁড়ে বসে আছে। এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমরা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।‘
তিনি মনে করেন, উদ্ভাবন মানে কেবল নতুন কোনো ডিভাইস তৈরি নয়, বরং বিদ্যমান সমস্যার সহজ সমাধান খুঁজে বের করা। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে গবেষণায় আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে ড. ইউনূস বর্তমান সরকারি ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, সরকারি নথিপত্রে বা ড্যাশবোর্ডে ডিজিটালাইজেশনের বড় বড় তথ্য থাকলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না।
‘বেশিরভাগ ডিজিটালাইজেশন এখন মন্ত্রণালয়ের চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি। ফাইলের কাজ কম্পিউটারে হওয়াই ডিজিটালাইজেশন নয়। প্রকৃত ডিজিটালাইজেশন তখনই সার্থক হবে, যখন গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ তার স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরকারি সব সেবা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই পেয়ে যাবে ‘বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তার সরকার সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর, ফাইল বা সার্ভার রুমে বন্দি রাখতে নয়।
ড. ইউনূসের মতে, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি তথ্য-প্রুক্তি খাতেও এক নতুন দিনের সূচনা করেছে। ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’ কেবল পণ্য প্রদর্শনীর জায়গা নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তনের প্রতীক।
এই এক্সপোতে প্রদর্শিত হচ্ছে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি এবং ব্লকচেইনের মতো অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। ড. ইউনূস আশা প্রকাশ করেন যে, এই মেলা থেকেই উঠে আসবে আগামীর ‘ইউনিকর্ন’ স্টার্টআপগুলো, যারা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়িয়ে দেবে।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মূল সুর ছিল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সংযোগ। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি দেশের সরকার তখনই শক্তিশালী হয় যখন সে তার জনগণের সাথে সরাসরি এবং সত্য তথ্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত থাকে। ইন্টারনেট বন্ধ করে গদি টিকিয়ে রাখার যে ব্যর্থ চেষ্টা গত সরকার করেছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।
ড. ইউনূসের এই ভাষণ প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করেছে। ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে নতুন এক উদ্ভাবনী যুগের পথে যাত্রা শুরু করেছে, সেখানে ইন্টারনেট আর কখনোই ‘নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার’ হবে না, বরং হবে ‘মুক্তির সোপান’।