
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি যখন রণতরীর দখলে আর আকাশ যখন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে প্রকম্পিত, তখন ওয়াশিংটনের যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে এক অভাবনীয় বিদ্রোহের সুর শোনা গেল সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে ঠেলে দেওয়ার প্রতিবাদে এবার সোচ্চার হয়েছেন আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধনকুবের এবং আল হাবতুর গ্রুপের চেয়ারম্যান খলাফ আহমদ আল হাবতুর।
একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে ট্রাম্পকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা কেবল একজন ব্যবসায়ীর ক্ষোভ নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষার এক আর্তনাদ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর আজ শনিবার যুদ্ধের অষ্টম দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন মোড় নিল। এতদিন আরব দেশগুলোর শাসকরা কূটনৈতিক ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, এবার আমিরাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী খলাফ আহমদ আল হাবতুর সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
হোটেল, রিয়েল এস্টেট, অটোমোবাইল ও শিক্ষা খাতের বিশাল সাম্রাজ্য আল হাবতুর গ্রুপ এর প্রতিষ্ঠাতা খলাফ আল হাবতুর ট্রাম্পের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রশ্ন করেছেন কেন এই অঞ্চলকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে টেনে আনা হলো। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমাদের এই শান্ত ও সমৃদ্ধ অঞ্চলকে ইরানের সঙ্গে এক বিধ্বংসী যুদ্ধে টেনে আনার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে।
এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত কি একান্তই আপনার নিজের, নাকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের চাপের ফসল। আল হাবতুর সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসি দেশগুলোকে এমন এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে যা তারা কখনও চায়নি।
চিঠিতে আল হাবতুর যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্পের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন হোয়াইট হাউস কি এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক ধস নামবে, তার কোনো হিসাব করেছে। তাঁর মতে, এই উত্তেজনায় আমেরিকা বা ইসরায়েল নয়, বরং প্রথম এবং প্রধান শিকার হবে উপসাগরীয় দেশগুলো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইরান যেভাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, তাতে এই অঞ্চলের পর্যটন ও বাণিজ্যিক শহরগুলোর নিরাপত্তা এখন খাদের কিনারে। আল হাবতুর মনে করেন ট্রাম্প এই দেশগুলোকে যুদ্ধের এপিসেন্টার বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।
চিঠিতে খলাফ আল হাবতুর কেবল অভিযোগই করেননি, বরং আরব দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে আরব দেশগুলো কারও করুণার ওপর টিকে নেই।
তিনি বলেন, আমরা সৌভাগ্যবশত যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী এবং অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে যারা আমাদের দেশকে রক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্নটি হলো নৈতিকতার, কোন সাহসে আপনি আমাদের ভূমিকে আপনার যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি পেলেন।
আল হাবতুরের এই বিস্ফোরক চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করলেও হোয়াইট হাউস বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে এই চিঠির দায় নেয়নি বা একে অনুমোদন দেয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন আল হাবতুরের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যখন প্রকাশ্যে এমন কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে আমিরাতের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে কতটা চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরানের ওপর মার্কিন ইসরায়েলি হামলার পর থেকে ইরান যে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তার আঁচ লেগেছে দুবাই, আবুধাবি ও মানামায়। পারস্য উপসাগরে ফ্রান্সের ৬০টি জাহাজ আটকে পড়া এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিরতা প্রমাণ করে যে আল হাবতুরের আশঙ্কা অমূলক নয়।
এই যুদ্ধ কেবল ইরানের ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, বরং পুরো আরবের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার এক নীল নকশা হতে পারে এমন ধারণাই এখন এই অঞ্চলের বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রবল হচ্ছে। খলাফ আহমদ আল হাবতুরের এই খোলা চিঠি ওয়াশিংটনের প্রতি আরব বিশ্বের এক শক্তিশালী প্রোটেস্ট নোট।
যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের হুমকি দিচ্ছেন, তখন তাঁর খোদ মিত্র দেশগুলোর ভেতর থেকে আসা এই সমালোচনা প্রমাণ করে যে আমেরিকার একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়, অন্যের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজের ঘর পুড়তে তারা আর রাজি নয়।
Leave a Reply