
নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদলের সময়ে আজ রোববার পুনরায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। স্পিকার বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই দিনের কার্যদিবসে সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতাসহ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ আলোচনার পর অধিবেশনটি আগামী ২৯ মার্চ বিকেল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করার ঘোষণা দেন স্পিকার।
অধিবেশনের এই সাময়িক বিরতি মূলত পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রস্তুতি এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণের আগে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কাজের সমন্বয় করার জন্য দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার সকাল ১১টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। অধিবেশনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের এক নতুন মেরুকরণ প্রত্যক্ষ করা যায়। সংসদ নেতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান উভয়ই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন পর দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের শীর্ষ নেতাদের সংসদ কক্ষে উপস্থিতি এক ধরনের স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে। স্পিকার বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমেদ নিরপেক্ষতার সাথে অধিবেশন পরিচালনা করে সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার প্রতি জোর দেন। গত ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন শুরু হলেও তা আজকের দিন পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়েছিল। আজ পুনরায় কাজ শুরু করার পর দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
শনিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে অধিবেশনের সময়সীমা এবং আলোচনার পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে।
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের এই প্রথম অধিবেশন আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। রমজান ও ঈদ পরবর্তী সময়গুলো বিবেচনায় নিয়ে অধিবেশনের সূচি সাজানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বর্তমান অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দেওয়া ভাষণের ওপর এক ম্যারাথন আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি অন্যতম দীর্ঘ আলোচনা হতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষের সংসদ সদস্যরা সংখ্যানুপাতে এই আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, সংবিধান সংস্কার এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো এই আলোচনায় উঠে আসবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাহী বিভাগকে আইনসভার কাছে জবাবদিহি করার অন্যতম মাধ্যম হলো ‘প্রশ্নোত্তর পর্ব’। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। সচিবালয়ের পরিসংখ্যানে
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে মোট ৮টি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন জমা পড়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের কাছে মোট ৪৬০টি প্রশ্ন করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত মোট ৪৬৮টি প্রশ্ন জমা পড়েছে, যা প্রমাণ করে যে সংসদ সদস্যরা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরব ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী।
আজকের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া বক্তব্যের রেশ ধরে সংসদে এক ধরনের গাম্ভীর্য বিরাজ করছে। বিশেষ করে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি এবং সংবিধান সংশোধনীর মতো বড় কাজগুলো সামনে রেখে ২৯ মার্চ পর্যন্ত এই বিরতি দেওয়া হয়েছে। ২৯ মার্চ অধিবেশন পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে টানা এক মাস অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করবে সংসদ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২৯ তারিখের পর এই বিষয়ে কোনো বিশেষ কমিটি গঠন বা বিল উত্থাপন করা হবে কি না, তা নিয়ে দেশবাসীর ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।
মুলতবি ঘোষণা করার আগে স্পিকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সংসদ সদস্যরা আগামী ২৯ মার্চ পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফিরবেন এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন। সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে এই সংসদ যে একটি উৎসবমুখর ও কার্যকর পরিবেশে পরিচালিত হবে, আজকের উপস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিয়েছে।
Leave a Reply