
পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি:: লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা আর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি সবসময়ই চ্যালেঞ্জের মুখে থাকে। তবে এসব প্রতিকূলতাকে জয় করে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় আঙ্গুর চাষে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কপিলমুনি ইউনিয়নের বিরাশি গ্রামের উদ্যমী উদ্যোক্তা তৈয়েবুর রহমান। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে।
সীমিত জমিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মাধ্যমে লাভবান হওয়া যে সম্ভব-তৈয়েবুর রহমান তার বাস্তব উদাহরণ। প্রায় তিন শতক জমিতে জিও ব্যাগ ব্যবহার করে তিনি আঙ্গুর চাষ করছেন, যা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একেবারেই নতুন ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জানা যায়, গত বছর তিনি পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র দুটি আঙ্গুর গাছ রোপণ করেন। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলন হওয়ায় তিনি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে প্রায় আট মাস আগে আরও ২০টি জিও ব্যাগে আঙ্গুর গাছ লাগান। বর্তমানে প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় আঙ্গুর ধরেছে, যার ওজন প্রায় এক কেজি বা তারও বেশি। গাছগুলোতে ফলের পরিমাণ ও মান দেখে স্থানীয় মানুষজন বিস্মিত এবং আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
মূলত জিও ব্যাগে চাষ করার ফলে গাছের শিকড় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাটি, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা করা যায়। এতে লবণাক্ত মাটির ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়। এছাড়া মাচা পদ্ধতিতে গাছগুলো উপরের দিকে ছড়িয়ে দেওয়ায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়, ফলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দুটোই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তৈয়েবুর রহমান জানান, কৃষির প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি নতুন কিছু করার চিন্তা করেন। অনলাইনে ইউটিউব ও বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক ওয়েবসাইট দেখে আঙ্গুর চাষ সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর সাহস করে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন।
তিনি বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম উপকূলীয় এলাকায় আঙ্গুর হবে কি না। কিন্তু চেষ্টা করে দেখলাম, সঠিক পদ্ধতি মেনে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। আগে স্কোয়াশ চাষ করে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষকের স্বীকৃতি পেয়েছি। এখন আঙ্গুর চাষে সফলতা পেয়ে আরও বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনা করছি। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষ করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, যে কেউ যদি আঙ্গুর চাষে আগ্রহী হয়, আমি তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি। আমাদের এলাকায় এই চাষ ছড়িয়ে পড়লে কৃষকরা নতুনভাবে লাভবান হতে পারবেন।
এদিকে পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের আরেক কৃষক তহিদুল ইসলামও আঙ্গুর চাষে সফল হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে তিনটি ভিন্ন জাতের আঙ্গুর চাষ করছেন এবং ভালো ফলন পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তার বাগানেও প্রতিনিয়ত স্থানীয় কৃষকরা পরিদর্শনে যাচ্ছেন এবং নতুনভাবে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. একরামুল হোসেন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় আঙ্গুর চাষ একটি ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সাধারণত এই অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আঙ্গুরের জন্য অনুকূল নয় বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন তৈয়েবুর রহমান ও তহিদুল ইসলাম।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা উন্মুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এ ধরনের উদ্ভাবনী কৃষি উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। শুধু আঙ্গুরই নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল চাষের পথও সুগম হবে। এতে করে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন উপকূলীয় কৃষি হুমকির মুখে, তখন এমন উদ্যোগই হতে পারে টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। আর সেই পথেই এক নতুন স্বপ্ন বুনছেন পাইকগাছার উদ্যোক্তা তৈয়েবুর রহমান-উপকূলের মাটিতে আঙ্গুরের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে।
বস আসসালামু আলাইকুম। আগের নিউজটি না দিয়ে এ নিউজটি প্রিন্টে দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি
Leave a Reply