
বেনাপোল প্রতিনিধি:: যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী ইউনিয়নের জিরেনগাছা গ্রামে চাঁদা না পেয়ে নবনির্মিত একটি সড়কের ইট উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ডাবলু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ডাবলুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্র জিরেনগাছা, কাশিয়াডাঙ্গা ও মাটিপুকুরিয়া গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিরামপুরের সারুন অ্যান্ড সাফা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, জিরেনগাছা এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৩ মিটার সড়ক সলিংয়ের কাজ করছিলেন তিনি। ১৫ জানুয়ারি কাজ শুরু হলে ডাবলু তার ছোট ভাইসহ কয়েকজন সহযোগী নিয়ে এসে সরাসরি টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার নেতৃত্বেই সড়কের ইট তুলে ফেলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঠিকাদার আরও জানান, শুরুতে জমি সংক্রান্ত কিছু অজুহাত দেখালেও পরে ডাবলু সরাসরি কাজ বন্ধ করে দেয় এবং শ্রমিকদের ঘটনাস্থল ছাড়তে বাধ্য করে। চাঁদার দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানালে ১৫ জানুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার পরপরই হামলা চালানো হয়। পরদিন ভোরে তিনি খবর পান, নির্মিত সড়কের এক পাশের ইট তুলে ফেলা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জিরেনগাছা গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে আছির উদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করেই মূলত বাধা সৃষ্টি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ শুরুর আগেই মাইকিং করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, এই সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। এমনকি রাজনৈতিক অজুহাত তুলে বলা হয়, সড়কটি হলে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের লোকজন সুবিধা পাবে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডাবলুর নেতৃত্বে তার ছোট ভাই নবাব সহ মাটিপুকুরিয়া, কাশিয়াডাঙ্গা ও আশপাশের গ্রামের ২০ থেকে ২৫ জন যুবক নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র নিয়মিত চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার মাধ্যমে পুরো এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে হলেও আগে তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। না করলে অনুষ্ঠান বন্ধ, হুমকি এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটে।
জিরেনগাছা গ্রামের বাসিন্দা ও উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোমিনুর রহমান বলেন, ডাবলু একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমার জানামতে, সে দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা তুলেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গাছ কেনার সময় ডাবলু জোর করে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে নেয়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১২ জানুয়ারি গ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হলেও ১১ জানুয়ারি রাতে ডেকোরেটরের মালামাল পৌছানোর পর ডাবলু ও তার সহযোগীরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এ সময় জিরেনগাছা বাজার মোড়ে প্রকাশ্যে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
উলাশী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ বলেন, ডাবলু বিএনপির কর্মী হলেও তার কোনো পদ নেই। আমি কখনো তাকে কাছে ভিড়তে দিইনি। কিন্তু স্থানীয় কিছু নেতা তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, এতে সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে এবং বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদেরও জানানো হয়েছে।
শার্শা থানা সূত্রে জানা গেছে, আরমান হোসেন ডাবলু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি অভিযুক্ত হন। এছাড়া বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিলেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫ সালের ৭ মার্চ ডিবি পুলিশ তাকে আটক করলেও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। জামিনে বেরিয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরমান হোসেন ডাবলুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, থানার রেকর্ডে অভিযুক্তের নামে তিনটি মামলা থাকলেও একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। মামলার সংখ্যা থাকলেই কাউকে দোষী বলা যায় না, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের। একই সঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় বর্তমানে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার বা ভিডিও বক্তব্য দেবেন না।
Leave a Reply