1. dailybanglarkhabor2010@gmail.com : দৈনিক বাংলার খবর : দৈনিক বাংলার খবর
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩৯ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম মার্কিন বোমারু বিমান বিধ্বস্তে নিহত ৮ ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র একনেকে ৭ হাজার কোটি টাকার ৫ প্রকল্প অনুমোদন বিশ্বকাপে প্রধানমন্ত্রী কোন দলের সাপোর্টার, জানালেন নিজেই পাইকগাছায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত বাগেরহাটে ভাই হত্যার বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন: জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পাইকগাছায় প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে লিডার্সের লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান-৮৭ বীজ বিতরণ নগরীতে ম্যাটেরিয়াল রিকভারী সেন্টারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বর্তমান সরকার দেশের অপার সম্ভাবনাময় সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী নৌবাহিনী পরিচালিত শিপইয়ার্ডে নির্মিত হচ্ছে সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ

প্রকৃতির বাধা ছাপিয়ে প্রকৌশলের জয় চিনে ২২.১৩ কিমি নতুন টানেল

  • প্রকাশিত: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪৪ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: চিন একবিংশ শতাব্দীর এমন এক রাষ্ট্র, যারা মানচিত্রের ওপর কেবল রেখা টানে না, বরং সেই রেখাকে বাস্তবে রূপ দিতে পাহাড় ছিদ্র করে এবং নদীর তলদেশ দিয়ে পথ তৈরি করে। চিনা পরিকল্পনাকারীদের কাছে এখন আর কোনো ভূখণ্ডই ‘দুর্গম’ নয়। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে তিব্বতের গভীর উপত্যকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমের গহীন অরণ্য সবখানেই চিনের হাইওয়ে নেটওয়ার্ক মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি চিনে উদ্বোধন হওয়া ২২.১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটি কেবল একটি সুড়ঙ্গ পথ নয়, এটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এমন এক দম্ভ, যা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে প্রকৃতির হাজার বছরের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক বাধা এখন মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য।

চিনের বিশাল ভূখণ্ডের এক বড় অংশই পাহাড়, নদী এবং মালভূমি দ্বারা আবৃত। ঐতিহাসিকভাবেই চিনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চল বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। আগে যেখানে একটি গ্রাম থেকে অন্য শহরে যেতে দিনভর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো, এখন সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

এই ২২.১৩ কিলোমিটারের টানেলটি মূলত একটি বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। চিনা পরিকল্পনাকারীদের মূল লক্ষ্য হলো ‘পারফেক্টলি স্ট্রেইট লাইন’ বা নিখুঁত সোজা রেখা। তারা মনে করেন, প্রকৃতির দেওয়া আঁকাবাঁকা পথ উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দেয়। তাই তারা পাহাড়ের চারপাশ দিয়ে ঘুরে না গিয়ে সরাসরি পাহাড়ের বুক চিরে সুড়ঙ্গ তৈরি করছেন। এর ফলে শত শত কিলোমিটারের দূরত্ব কমে আসছে কয়েক দশ কিলোমিটারে।

যেকোনো টানেল নির্মাণেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভূতাত্ত্বিক জটিলতা। এই প্রজেক্টের ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের এমন কিছু স্তরের মোকাবিলা করতে হয়েছে, যা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং পানি জমে থাকা পাথুরে জমি।

এখানে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টিবিএম (Tunnel Boring Machine)। মাটির গভীরে কয়েক সেন্টিমিটারের বিচ্যুতিও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত, কিন্তু চিনা স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ২২ কিলোমিটার লম্বা সুড়ঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।

এই টানেলটির মাধ্যমে চিন প্রমাণ করেছে যে, ভূ-তত্ত্ব (Geology) এখন প্রকৌশলবিদ্যার (Engineering) কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত।

চিনের এই অবকাঠামোগত উন্মাদনা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির জন্য নয়। এটি এখন চিনের সবচেয়ে ‘ধারালো হাতিয়ার’ (Sharpest Tool)।

প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোকে রাজধানীর সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে চিন তার শাসন ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করছে। তিব্বত বা জিনজিয়াংয়ের মতো অঞ্চলগুলোতে দ্রুত সেনা মোতায়েন বা পণ্য সরবরাহের জন্য এই হাইওয়ে এবং টানেলগুলো অপরিহার্য।

এই টানেলগুলো মূলত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এর অংশ। চিন চাচ্ছে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপের সাথে এমন এক স্থলপথ তৈরি করতে, যা কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক বাধার কারণে আটকে থাকবে না।

চিন যখন বিশ্বকে দেখায় যে তারা ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল অনায়াসেই তৈরি করতে পারে, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে চিন তার প্রকৌশল জ্ঞান এবং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।

চিনের প্রতিটি বড় শহর এখন হাই-স্পিড রেল এবং এক্সপ্রেসওয়ে দ্বারা সংযুক্ত। কিন্তু পরিকল্পনাকারীরা এখানেই থেমে নেই। তারা এখন ‘এক গ্রাম, এক পথ’ নীতিতে কাজ করছে।

এই মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়া হাইওয়েগুলোর বিশেষত্ব হলো—এগুলো কোনো প্রাকৃতিক ঢাল অনুসরণ করে না। যেখানে গভীর উপত্যকা, সেখানে তৈরি করা হয়েছে আকাশচুম্বী সেতু (যেমন—বেইপানজিয়াং ব্রিজ), আর যেখানে বিশাল পাহাড়, সেখানে তৈরি হচ্ছে এই ২২.১৩ কিলোমিটারের মতো দীর্ঘ টানেল।

প্রকৃতিকে জয় করার এই নেশায় পরিবেশবাদীরা কিছুটা চিন্তিত। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ তৈরি করার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তিত হতে পারে। এছাড়াও বন্যপ্রাণীদের চলাচলের পথ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে চিনা সরকার দাবি করছে, তারা ‘সবুজ প্রকৌশল’ (Green Engineering) অনুসরণ করছে, যেখানে টানেলের মুখগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বনাঞ্চলের ক্ষতি সর্বনিম্ন হয়।

এক সময় চিনকে বলা হতো ‘বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র’। গ্রেট ওয়াল বা চিনের প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল বহিরাগতদের ঠেকাতে। কিন্তু আজকের চিন প্রাচীর ভাঙার চেয়ে প্রাচীর ফুঁড়ে পথ তৈরিতে বেশি আগ্রহী। এই ২২.১৩ কিলোমিটারের সুড়ঙ্গটি চিনের সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা বলে—প্রকৃতি পথ দেবে না, আমরা পথ বানিয়ে নেব।

আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে চিনের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি কোণকে এমনভাবে সংযুক্ত করা যাতে কোনো অঞ্চলের মানুষ নিজেকে কেন্দ্র থেকে দূরে মনে না করে। এই মহাপরিকল্পনায় আরও কয়েক ডজন টানেল এবং মেগা-ব্রিজ পাইপলাইনে রয়েছে।

২২.১৩ কিলোমিটারের এই নতুন টানেলটি কোনো সাধারণ নির্মাণ কাজ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ইশতেহার। এটি বিশ্বকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, চিন এখন পৃথিবীর মানচিত্র নিজের মতো করে পুনর্লিখন করছে। পাহাড়, নদী কিংবা গভীর উপত্যকা—কোনো কিছুই এখন আর স্থায়ী বাধা নয়। প্রকৌশলবিদ্যার জাদুতে চিন আজ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে, যা আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

ভবিষ্যতে হয়তো আমরা দেখব আরও দীর্ঘতর সুড়ঙ্গ বা গভীরতর সেতু, কিন্তু এই টানেলটি চিরকাল মনে করিয়ে দেবে সেই মুহূর্তকে, যখন মানুষ নিশ্চিতভাবে প্রকৃতিকে তার প্রকৌশল কৌশলে পরাজিত করেছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক বাংলার খবর
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট