রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২৮ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
বিএনপি নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ, ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার অপসারণ দাবি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখবে মোংলা বন্দর সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ডের উদ্যোগে ২০ হাজার চারা রোপণ করা হবে বাগেরহাট পৌর বিএনপির আয়োজনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত কোস্টগার্ডের অভিযানে ভারত থেকে পাচার করে আনা পণ্য জব্দ শার্শা ও বেনাপোলের বিভিন্ন বাজারে কাচাঁ মরিচের দাম কমে অর্ধেকে নেমেছে দিঘলিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা টুটুলের উদ্যোগে ও বিএনপির সহযোগিতায় জলাবদ্ধতার অবসান বাগেরহাটে ৯ হাজার ৭৩০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার বাগেরহাটে নিরাপত্তা ও বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন আমরা মাদককে না বলব, সন্ত্রাসকে না বলব এবং খেলাধুলাকে হ্যাঁ বলব-আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী

বাংলার মসনদ কার দখলে? দিদির হ্যাটট্রিক নাকি মোদির জয়ধ্বনি

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬
  • ১২০ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনী রণক্ষেত্র এখন উত্তপ্ত। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া এই মহাসংগ্রামের চূড়ান্ত যবনিকা উন্মোচিত হবে আগামী ৪ মে। জনবহুল এই রাজ্যে মূলত লড়াইয়ের সমীকরণ আবর্তিত হচ্ছে দুটি মেরুকে কেন্দ্র করে, একটি হলো রাজ্যের দীর্ঘদিনের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, আর অন্যটি হলো দিল্লির তখতে আসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।

একদিকে রয়েছেন অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী অগ্নিকন্যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ঝোড়ো হাওয়া। সারা ভারতের নজর এখন পশ্চিমবঙ্গের দিকে, শেষ পর্যন্ত জয়মালা কার গলায় উঠবে, দিদি নাকি মোদি?

‎বাংলার রাজনীতি বরাবরই বৈচিত্র্যময়। এবারের নির্বাচনে প্রচারের কৌশলে তৃণমূল কংগ্রেস এক অভিনভ মাত্রা যোগ করেছে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে তারা পৌঁছে দিচ্ছে দিদি বনাম মোদি নামে একটি বিশেষ সাপলুডুর বোর্ড। খেলার এই বোর্ডে বড় বড় সাপের মাথায় বসানো হয়েছে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর ছবি। এর মাধ্যমে তৃণমূলের বার্তা পরিষ্কার, কেন্দ্রীয় সরকারকে ভোট দেওয়া মানেই হলো বিপদে পড়া বা সাপের মুখে পড়া।

অন্যদিকে মই হিসেবে দেখানো হয়েছে দিদির জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলোকে। এই প্রতীকী খেলাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করেছে, যা গ্রামীণ বাংলায় প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

‎২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে বিজেপি মাত্র ৩টি আসন পেয়েছিল, ২০২১ সালে তারাই ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। গত কয়েক বছরে বাংলায় বিজেপির এই ক্রমবর্ধমান উত্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিজেপির এই অগ্রযাত্রা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের বিস্তার নয়, বরং এটি উত্তর ও পশ্চিম ভারতের হিন্দুত্ববাদী চেতনার বাংলায় অনুপ্রবেশের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শুভেন্দু অধিকারীর মতো একসময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতাদের পাশে নিয়ে বিজেপি এবার কোমর বেঁধে নেমেছে দিদির হ্যাটট্রিক রুখতে।

‎এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে জোরালো ইস্যু হলো বাঙালি পরিচয় বা বেঙ্গল আইডেন্টিটি। তৃণমূল কংগ্রেস সুকৌশলে বিজেপিকে হিন্দি বলয়ের দল বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ভোটারদের মনে এমন এক শঙ্কা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা এবং খাদ্যাভ্যাস হুমকির মুখে পড়বে।

বিশেষ করে মাছে ভাতে বাঙালির পাতে নিরামিষাশী আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে, এমন একটি আতঙ্ক সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কাজ করছে। এই আতঙ্ক কাটাতে বিজেপি প্রার্থীরা অভিনব কায়দায় প্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি কলকাতার এক বিজেপি প্রার্থীকে হাতে বড় মাছ নিয়ে বাজারে প্রচার করতে দেখা গেছে, যা মূলত ভোটারদের আশ্বস্ত করারই একটি প্রচেষ্টা।

উল্লেখ্য যে, যে মাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন কিংবা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিশ্বনন্দিত সন্তানদের জন্ম দিয়েছে, সেই মাটির মানুষ তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
‎পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলিম, যারা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে তুরুপের তাস। ঐতিহাসিকভাবে এই বিশাল ভোটব্যাংক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকে থাকে। তবে এবারের চিত্র কিছুটা ঘোলাটে।

অভিযোগ উঠেছে যে, ভোটার তালিকা থেকে সুকৌশলে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তৃণমূল নেত্রী ও কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাউন্সিলর পর্দা পারভিনের দাবি, সরকারি কর্মকর্তারা ঠুনকো অজুহাতে মুসলিমদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন। ভোটারদের মনে ভয় ঢুকেছে যে, নাম বাদ পড়া মানেই হলো নাগরিকত্ব হারানো এবং ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়া। এই আতঙ্ক কি মুসলিম ভোটারদের মমতার দিকে আরও বেশি ধাবিত করবে, নাকি তারা নতুন কোনো সমীকরণ খুঁজবে, তা ৪ মে পরিষ্কার হবে।

‎একদিকে মমতা সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সরাসরি অর্থ সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে শাসক দল। ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিকেল কলেজে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার নারকীয় ঘটনা সারা বাংলাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

সাধারণ মানুষের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তাকেই বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নারী সুরক্ষা এখন আর কেবল স্লোগান নয়, বরং ব্যালট পেপারে বড় প্রভাব ফেলার মতো একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

‎পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মের কাছে বড় সমস্যা হলো কর্মসংস্থানের অভাব। শিল্পায়নের ধীরগতি এবং শিক্ষিত বেকারদের দীর্ঘ হতাশা তৃণমূলের বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যোগ হয়েছে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি। অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে তৃণমূলের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিজেপি এই দুর্নীতির বিষয়টিকে বারবার সামনে এনে মধ্যবিত্ত বাঙালির নৈতিকতায় আঘাত হানার চেষ্টা করছে।

‎পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশ যখন দিদি বনাম মোদি দ্বন্দ্বে বিভক্ত, উত্তরবঙ্গের চিত্র তখন সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার ৮টি জেলার ৫৪টি আসনে বিজেপি বিগত সময়ে ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করেছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে ভাষা বা ধর্মের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে উন্নয়ন আর কর্মসংস্থান। পাহাড় ও তরাই অঞ্চলের মানুষ মনে করেন, কলকাতার সরকার বছরের পর বছর ধরে তাদের অবহেলে করেছে। এই বঞ্চনার রাজনীতি উত্তরবঙ্গকে বিজেপির দুর্গে পরিণত করেছে। উত্তরবঙ্গের এই শক্ত অবস্থান বিজেপির নবান্ন দখলের স্বপ্নকে জ্বালিয়ে রাখছে।

‎পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এখন কেবল একটি আঞ্চলিক নির্বাচন নয়, এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের নির্দেশক। মোদির উন্নয়ন ও হিন্দুত্ববাদের গ্যারান্টি, নাকি মমতার মা মাটি মানুষ ও ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষাকবচ, বাঙালি ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন? বিজেপির জন্য এটি একটি বিশাল পরীক্ষা, যেখানে তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা কেবল হিন্দি বলয়ের দল নয়। আর মমতার জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ৪ মের ফলাফল জানিয়ে দেবে, গঙ্গার জল কোন দিকে গড়ায়। বাংলার মসনদে কি মমতা তাঁর চতুর্থ অধ্যায় শুরু করবেন, নাকি গেরুয়া ঝড় সব সমীকরণ ওলটপালট করে দেবে? উত্তর জানতে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

‎তৃণমূলের শক্তির জায়গাগুলো হলো সরকারি প্রকল্প যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বাঙালি পরিচয় এবং মুসলিম ভোট।

অন্যদিকে বিজেপির শক্তির জায়গা হলো হিন্দুত্ববাদ, মোদি ম্যাজিক, উত্তরবঙ্গের সমর্থন এবং দুর্নীতির অভিযোগ। এবারের নির্বাচনে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হতে পারে নারী নিরাপত্তা বিশেষ করে আরজি কর কাণ্ড, বেকারত্ব এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া।

বাংলার ভাগ্যাকাশে এখন কালো মেঘের আড়ালে কোন সূর্যের উদয় হবে তা সময়ই বলবে। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, এবারের নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক বাংলার খবর
Theme Customized By BreakingNews