
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রয়াণের পর এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অবশেষে নতুন অভিভাবক খুঁজে পেল ইরান। রোববার ইরানের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে চূড়ান্ত নাম নিয়ে এখনো বজায় রাখা হয়েছে কঠোর গোপনীয়তা।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আহমাদ আলামোলহোদা আজ দুপুরে নিশ্চিত করেছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কিছু প্রশাসনিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টের সচিবালয়ের প্রধান হোসেইনি বুশেহরি এই নাম ঘোষণার চূড়ান্ত দায়িত্ব পালন করবেন। খুজেস্তান প্রদেশের প্রতিনিধি মোহসেন হায়দারি জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ‘সবচেয়ে উপযুক্ত’ প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে।
নতুন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি বিশেষ ও কঠোর পরামর্শ অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ পরিষদের এক সদস্য জানান, খামেনি চেয়েছিলেন তার উত্তরসূরি এমন একজন ব্যক্তি হবেন, যাকে পশ্চিমা শক্তি বা ‘শত্রুরা’ মোটেও পছন্দ করবে না।
পরিষদ সদস্য হায়দারি আলেকাসির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এমনকি ‘বড় শয়তান’ (যুক্তরাষ্ট্র) যার নাম নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তিনিই হতে যাচ্ছেন আমাদের কান্ডারি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মন্তব্যের মাধ্যমে ইরানের রক্ষণশীল ও আপোষহীন কোনো নেতার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল প্রয়াত খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনি। তবে কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, মোজতাবা খামেনি তার প্রশাসনের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’। ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ সম্ভবত এমন কাউকে বেছে নিয়েছে, যা পশ্চিমাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনের খবর আসতেই ইসরায়েল কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেলআবিবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানের নতুন নেতা যিনিই হোন না কেন, তাকে আমাদের লক্ষ্যবস্তু (Target) হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইতিমধ্যেই তেহরানের তেল শোধনাগারে ইসরায়েলি হামলায় ‘আগুনের নদী’ তৈরি হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে নতুন নেতার অভিষেক ইরানের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ইরানের শাসনব্যবস্থায় ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় আলেমের এই কাউন্সিলটি সবচেয়ে শক্তিশালী। তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন এবং তাদের একমাত্র প্রধান কাজ হলো সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা বা প্রয়োজনবোধে তাকে অপসারণ করা। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন যিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ বজায় রাখার পাশাপাশি বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবেন।
ইরানের এই নেতৃত্ব পরিবর্তন কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আজ সকালেই বাংলাদেশের জ্বালানিমন্ত্রী ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে রেশনিং ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয় পক্ষই এখন তেহরানের পরবর্তী ঘোষণার দিকে তাকিয়ে আছে।
ইরান কি একজন কট্টরপন্থী সামরিক মনোভাবাপন্ন নেতাকে সামনে আনবে, নাকি কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের কোনো পথ খুঁজবে তা নাম ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে। তবে নাম প্রকাশ না করার এই রহস্যময়তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তেহরান বিশ্বকে একটি বড় ধরনের চমক দিতে যাচ্ছে।
Leave a Reply