
ডেস্ক:: গণতন্ত্রের চাকা সচল রাখতে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বার্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ক্ষমতা বা পদ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়; বরং জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকাই একজন সরকারি কর্মকর্তার পরম দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার যেমন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আসে, ঠিক তেমনি জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য ব্যক্তিগত সম্পদ বা চিরস্থায়ী কোনো বিষয় নয়। পদ পরিবর্তনের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে মেনে নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক সময় কর্মকর্তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পোস্টিং বা বড় শহরে থাকার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের মানচিত্রের প্রতিটি বিন্দু সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, একটি সরকার যেরকম চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। প্রতিটি পদকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য ভাবুন। দেশের যেকোনো স্থানেই যেকোনো সময়ে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য মূলত মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রশাসনের দক্ষতা কেবল সচিবালয়ের ফাইলবন্দি কাজে নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। কোনো পদকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই, কারণ প্রতিটি চেয়ারই রাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনের ভূমিকা কতটুকু শক্তিশালী হতে পারে, তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, তবেই জনরায়ের সঠিক প্রতিফলন ঘটা সম্ভব। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনপ্রশাসন যে সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সামনের দিনেও কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমের সাথে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা ছিল পদোন্নতি এবং পোস্টিং সংক্রান্ত অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিয়ে। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, অনেক সময় কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার জন্য নীতি বা পেশাদারিত্বের সাথে আপস করেন।
যখন মেধার চেয়ে তদবির বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধার লোভে কাজ করলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। সাময়িকভাবে কোনো ব্যক্তি লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনপ্রশাসন কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়।Politics
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সাথে আপোস করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সাময়িকভাবে হয়তো লাভবান হতে পারেন। তবে সেটি সামগ্রিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার ওপরে একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ডিসি সম্মেলনে আগত জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, জেলা প্রশাসকরা হলেন সরকারের নীতি বাস্তবায়নের প্রধান কারিগর। জেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকে তাদেরই। তাই তাদের আচরণ এবং কাজ যেন জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
১. জনগণের দোরগোড়ায় সেবা: সরকারি সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়।
২. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি: সরকারের নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলো যেন সঠিক সময়ে এবং স্বচ্ছতার সাথে শেষ হয়, তা নিশ্চিত করা জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব।
৪. শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা: স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ কেবল একটি উদ্বোধনী বক্তব্য নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্মার্ট জনপ্রশাসন গড়ে তোলার রূপরেখা। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠে একটি জনবান্ধব প্রশাসন অত্যন্ত জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ‘সেবামূলক প্রশাসন’ নিশ্চিত করতে চায়। কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে যে, তারা জনগণের শাসক নন, বরং সেবক। ক্ষমতার দম্ভ বা পদের মোহ যেন তাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না করে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেশগুলো হৃদয়ে ধারণ করেন, তবে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, চার দিনব্যাপী এই ডিসি সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো সমাধানের নতুন পথ খুঁজে বের করবেন। সরকারের নীতি এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করবে এই জনপ্রশাসন- এমনটাই জাতির প্রত্যাশা।
Leave a Reply