
বিশেষ প্রতিবেদন:: বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনসেবার চেয়ে ‘সম্পদ বৃদ্ধি’র প্রতিযোগিতা যে প্রবল হয়ে উঠেছে, তার এক নগ্ন প্রতিফলন দেখা গেছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে ৮৯১ জনই কোটিপতি। অর্থাৎ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই এখন কোটি টাকার সম্পদের মালিক। এই বিপুল বিত্তের মালিকানার চিত্রটি উঠে এসেছে প্রার্থীদের দেওয়া নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য ও হলফনামায় উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে এক ভয়াবহ বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবি জানায়, ৮৯১ জন কোটিপতি প্রার্থীর মধ্যে এমন ২৭ জন রয়েছেন যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সংস্থাটির মতে, রাজনীতি এখন আর কেবল আদর্শের লড়াই নেই, বরং এটি উচ্চবিত্তদের একচেটিয়া অধিকার ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীদের সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রবণতা সমানুপাতিক হারে বাড়ছে। এটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে প্রার্থীদের স্থাবর (জমি, দালান) ও অস্থাবর (নগদ টাকা, স্বর্ণ, শেয়ার) সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নিজেদের আয়ের চেয়ে তাদের স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের নামে সম্পদ অর্জনের হার আরও বেশি উদ্বেগজনক। টিআইবি বলছে, হলফনামায় অনেক প্রার্থী সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য গোপন করেন অথবা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের মূল্য নগণ্য করে দেখান। এরপরও ৮৯১ জনের কোটিপতি হওয়া প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এখন নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ সদস্য পদটি এখন ব্যবসায়িক সুরক্ষা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। টিআইবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রার্থীদের পেশার ধরনেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। কৃষিজীবী বা শিক্ষকতা পেশার মানুষ কমে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন বড় বড় শিল্পপতি ও আমদানিকারকরা।
আরও দেখুন
ডিজিটাল বিজ্ঞাপন পরিষেবা
মেসেঞ্জার সংবাদ
ভ্রমণ ও প্রবাস বিষয়ক গাইড
শতকোটিপতি ২৭ জন প্রার্থীর প্রায় সবাই বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের সাথে যুক্ত। তাদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেকেরই গত ৫ থেকে ১০ বছরে সম্পদের পরিমাণ কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, কোন জাদুবলে একজন জনপ্রতিনিধির সম্পদ ৫ বছরে ১০ গুণ বা ২০ গুণ বাড়তে পারে, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কমিশন ব্যয়ের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে টিআইবির আশঙ্কা, কোটিপতি প্রার্থীদের এই বিপুল সম্পদ নির্বাচনের মাঠে টাকার খেলা বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে সৎ ও যোগ্য কিন্তু আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভোটারদের প্রভাবিত করা, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের পেছনে এই কালো টাকার প্রভাব অনস্বীকার্য। টিআইবি দাবি করেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এই অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির উৎস অনুসন্ধান করতে হবে।
উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, একই দিনে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিত্তবান প্রার্থীদের আধিপত্য সাধারণ ভোটারদের আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে। টিআইবি মনে করে, প্রার্থীদের হলফনামার তথ্যগুলো কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে তা জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা এবং ভুল তথ্যের জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মোট প্রার্থী: প্রায় ২,০০০ জন।
কোটিপতি প্রার্থী: ৮৯১ জন।
শতকোটিপতি প্রার্থী: ২৭ জন।
সম্পদ বৃদ্ধির হার: অনেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ৫০০% থেকে ২,০০০% পর্যন্ত।
প্রধান পেশা: ৬০ শতাংশের বেশি প্রার্থীর পেশা ব্যবসা।
টিআইবির এই প্রতিবেদনটি মূলত রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের একটি প্রামাণ্য দলিল। যখন সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন জনপ্রতিনিধি হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সম্পদের এই পাহাড় রাজনৈতিক নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাজনীতি যদি কেবল বিত্তশালীদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর সংসদে কতটা প্রতিধ্বনিত হবে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
Leave a Reply